নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে করছাড়ের পাশাপাশি বিপুল অঙ্কের একটি বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার। ছবি: গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের উদীয়মান স্টার্টআপ, তরুণ উদ্যোক্তা এবং ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সিং খাতকে গতিশীল করতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের নীতিগত সহায়তার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে করছাড়ের পাশাপাশি বিপুল অঙ্কের একটি বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, তরুণদের ডিজিটাল কর্মকাণ্ড ও আয়ের সুযোগ অবারিত রাখতে এই খাতগুলোকে সম্পূর্ণ করমুক্ত করার পাশাপাশি স্থান ভাড়া, সেবা আমদানি এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যমান সব ধরণের ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব আসতে যাচ্ছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে।
আগামীকাল ১১ জুন জাতীয় সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে। বর্তমান সরকারের প্রথম এই বাজেটে দেশের তরুণ ও প্রযুক্তি খাতের জন্য বড় রকমের চমক থাকছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এর অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিভিন্ন করের বিভ্রান্তি দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি বহির্ভূত খাতের ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের ওপর যে সাড়ে ৭ শতাংশ কর বলবৎ রয়েছে, তা পুরোপুরি প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। একই সাথে ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকের মতো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের অর্জিত আয়কেও সম্পূর্ণ করমুক্ত ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারের এই নতুন উদ্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হচ্ছে স্টার্টআপ খাতের স্থানীয় পর্যায়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি। শুধু স্থানীয় পর্যায়ই নয়, এই খাতের ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্থান বা স্থাপনা ভাড়া এবং আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সেবা আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ১৫ শতাংশ ভ্যাটও পুরোপুরি মওকুফ করার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদী সুফল নিশ্চিত করতে এই ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা আগামী ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসার ওপর বিদ্যমান শূন্য দশমিক ১ শতাংশ টার্নওভার কর বিলুপ্ত করে তা শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে, যা লোকসানে থাকা ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরণের আর্থিক স্বস্তি নিয়ে আসবে।
নীতিগত এই সহায়তার পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরণের আর্থিক জোগান দেওয়ার প্রস্তুতিও চূড়ান্ত করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে সম্প্রতি এক প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী বাজেটে স্টার্টআপ, নারী এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য মোট ৪০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ২০০ কোটি টাকা, যা নতুন বাজেটে দ্বিগুণ করা হচ্ছে। এই অর্থায়নের বাইরেও ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড’ এবং অর্থ বিভাগের বিভিন্ন তহবিলের সমন্বয়ে সারা দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণের বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে বলে জানা গেছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। দেশে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় এক হাজারের বেশি স্টার্টআপ কাজ করছে, যার মধ্যে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত এক মিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। দেশীয় অর্থায়নের তীব্র সংকটের এই সময়ে সরকারি তহবিল গঠন এবং টার্নওভার করের মতো বাড়তি চাপ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে করছাড়ের এই সুফলের পাশাপাশি দেশের উদীয়মান তরুণদের ডিজিটাল কার্যক্রমে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে মোবাইল ডেটার মূল্য কমানোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।