তাজউদ্দীন থেকে খসরু/
আহমেদ তোফায়েল
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তর থেকে আজকের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাÑ বাংলাদেশের বাজেট সেই দীর্ঘ পথচলার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সীমিত ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রণীত ক্ষুদ্র বাজেট সাড়ে পাঁচ দশক পর আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে বাজেট উপস্থাপনের ধরন, পরিসংখ্যানের বিন্যাস এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) পরিধি। সরকারের আয়-ব্যয়ের খাতে নতুন নতুন বিষয় সংযোজিত হওয়ায় বাজেটের আকার ও ব্যাপ্তি ক্রমাগত বিস্তৃত হয়েছে।
স্বাধীনতা-উত্তর
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১৪ জন ব্যক্তি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। আজ বৃহস্পতিবার
বিএনপি সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার প্রথম বাজেট উপস্থাপন
করতে যাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের বাজেট ইতিহাসে যুক্ত হবে ১৫তম অর্থমন্ত্রীর নাম,
আর তিনি পেশ করবেন ৫৫তম জাতীয় বাজেট। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী আমির খসরু মাহমুদ
চৌধুরীর জন্য এটি হবে বাজেট প্রণয়ন ও উপস্থাপনায় প্রথম নেতৃত্ব, যা ইতিহাসে একটি নতুন
অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। গত অর্থবছরে বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের
সাবেক গভর্নর ও অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নের পেছনে রয়েছে
এক গৌরবময় ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী
এম মনসুর আলী জুলাই-সেপ্টেম্বর মেয়াদের জন্য প্রথম যুদ্ধকালীন বাজেট প্রণয়ন করেন। অস্থায়ী
রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অনুমোদিত ওই বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ কোটি
৭৪ লাখ ১৮ হাজার ৯৯৮ টাকা এবং ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ কোটি ৬২ লাখ ৪৮ হাজার ২০৪ টাকা। মাত্র
৮৮ লাখ ২৯ হাজার ২০৬ টাকার ঘাটতিসহ সেই ক্ষুদ্র বাজেট থেকেই বাংলাদেশের যাত্রা শুরু;
আর আজ দেশ পৌঁছেছে লাখ কোটি টাকার আধুনিক বাজেটের যুগে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৩০
জুন দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭১-৭২ এবং ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের
জন্য মোট ৭১৯.৪৩ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন। বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত সেই প্রথম
বাজেট বক্তৃতায় নতুন কর আরোপের চাপ ছিল না; বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, অর্থনীতিকে
সচল করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পুনর্বাসনের আন্তরিক অঙ্গীকারই ছিল তার মূল প্রতিপাদ্য।
পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি যত জটিল হয়েছে,
বাজেটের চরিত্রও তত বদলেছে। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম সংসদীয়
বাজেট পেশ করেন। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও ডলার সংকটের প্রভাবে দেশে দ্রব্যমূল্যের
ঊর্ধ্বগতি ও খাদ্যসংকট দেখা দেয়। ফলে তিনি করমুক্ত বাজেট দিতে পারেননি; বরং দেশের বাস্তব
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে তুলে ধরেন। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, শুধু স্লোগান
দিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দূর বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়।
১৯৭৪-৭৫ অর্থবছর ছিল অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন
আহমদের শেষ বাজেট, যা তিনি তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে উপস্থাপন করেন। পরের অর্থবছরে
ড. এ আর মল্লিক এমন একটি বাজেট পেশ করেন, যা দেশের বাজেট ইতিহাসে একমাত্র সাধু ভাষায়
রচিত বাজেট হিসেবে পরিচিত। সে বাজেটে বেসরকারি পুঁজির সীমা ২৫ লাখ টাকা থেকে ৩ কোটি
টাকায় উন্নীত করা হয় এবং টাকার মান ৫৮ শতাংশ অবমূল্যায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক
সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এরপর সামরিক শাসনামলে অর্থনীতিতে কাঠামোগত
পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। তৎকালীন সেনাপ্রধান ও উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান
১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত টানা তিনটি বাজেট উপস্থাপন করেন। তার আমলেই রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত
অর্থনীতি থেকে সরে এসে বেসরকারি খাতকে শিল্পায়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার
প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯৭৬-৭৭
অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয় এবং ন্যূনতম করযোগ্য
আয়ের সীমা ৮ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়। জিয়াউর রহমান তার বাজেট
বক্তৃতায় এ সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান এবং কর ফাঁকিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের
কথা ঘোষণা করেন। তার আমলেই ১৯৭৬ সালে ‘ট্যাক্সেশন এনকোয়ারি কমিশন’ গঠিত হয়, যা অভ্যন্তরীণ
সম্পদ আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আশির দশকে বাংলাদেশের বাজেট বিশ্ব অর্থনৈতিক
মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মুখে পড়ে। ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী মীর্জা নুরুল
হুদার পর দায়িত্ব নেন এম সাইফুর রহমান। ১৯৮০-৮১ অর্থবছরের বাজেটে তিনি জিয়াউর রহমানের
‘খাল কাটা কর্মসূচি’র উল্লেখ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে
তুলে ধরেন। আর ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মাত্র পাঁচ দিন পর উপস্থাপিত
বাজেটে দেশের বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর অর্থনীতির বাস্তব চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারির পর অর্থমন্ত্রী
হিসেবে দায়িত্ব নেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। তার ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতা ছিল
দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনা, যেখানে তিনি শূন্য প্রবৃদ্ধি ও দুর্বল বৈদেশিক রিজার্ভের
বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন এবং বেসরকারি ব্যাংক খোলার পথ উন্মুক্ত করার কথা বলেন।
এরপর অর্থ উপদেষ্টা এম সাইদুজ্জামান
নতুন আয়কর আইন প্রণয়ন ও খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ নেন। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যা
ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে অর্থমন্ত্রী ড. ওয়াহিদুল হক ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরের বাজেট পেশ
করেন, তবে বৈদেশিক রিজার্ভ সংকটের কারণে পরে তিনি পদত্যাগ করেন। ফলে এরশাদ সরকারের
শেষ বাজেট উপস্থাপন করেন মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল মুনএম, যেখানে কর-জিডিপি অনুপাত
বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নব্বইয়ের দশকে গণতান্ত্রিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার
পর অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার আনেন। ১৯৯১ সালের ১ জুলাই
তিনি আবগারি শুল্কের পরিবর্তে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) চালু করেন। পাশাপাশি যমুনা সেতুর
সারচার্জ ও লেভি প্রত্যাহার এবং ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচিকে উন্নয়ন বাজেটে অন্তর্ভুক্ত
করে হিসাব-নিকাশ আরও স্বচ্ছ করেন।
১৯৯৬ সালে অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া
দায়িত্ব নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ‘বয়স্ক ভাতা’ চালু করেন, যার জন্য
প্রথমবার ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তার সময়ে শেয়ারবাজার, শিল্প খাত ও বিলাসবহুল
গাড়ি আমদানিতে ৫ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগও দেওয়া হয়।
২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আবারও দায়িত্বে
ফিরে এম সাইফুর রহমান কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
জোরদার করেন। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল
ইসলাম করমুক্ত আয়ের সীমা দেড় লাখ টাকা করেন, ভ্যাটের পরিধি বাড়ান এবং করপোরেট কর হ্রাস
করেন।
২০০৯ থেকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল
মুহিত ধারাবাহিকভাবে বড় আকারের বাজেট উপস্থাপন করেন। তার সময়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব
(পিপিপি), নতুন ভ্যাট ও আয়কর আইনের খসড়া অনুমোদন এবং মোবাইল বিলের ওপর সারচার্জসহ আধুনিক
করব্যবস্থার বিস্তার ঘটে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে করের সর্বোচ্চ হার ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে
উন্নীত করা হয়।
এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এবার সূচিত হচ্ছে
এক নতুন অধ্যায়। ১৯৯১ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত এবং পরবর্তীতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের
দায়িত্ব পালন করা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী
হিসেবে তার প্রথম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্যের দীর্ঘ
রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।