ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট করপোরেট কর রোডম্যাপ ঘোষণা করা হতে যাচ্ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট করপোরেট কর রোডম্যাপ ঘোষণা করা হতে যাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত করপোরেট করের বর্তমান হার অপরিবর্তিত রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যবসায়ীদের মাঝে নীতিগত ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা প্রদান করা।
আগামী ১১ জুন নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষিত দুই বছরের পরিকল্পনার পরিধি আরও বাড়িয়ে অর্থমন্ত্রী তার প্রথম বাজেটে তিন বছরের একটি সুনির্দিষ্ট ও অনুমানযোগ্য কর কাঠামোর রূপরেখা তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে, গত ১৪ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন দেন।
প্রস্তাবিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য করপোরেট করহার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ বহাল থাকবে। তবে কোনো কোম্পানি যদি তাদের সমস্ত লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করে, তবে তারা বিশেষ ছাড়ের আওতায় আসবে। সে ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমে যথাক্রমে ২০ শতাংশ এবং ২৫ শতাংশে দাঁড়াবে। এ ছাড়া এক ব্যক্তিক কোম্পানির (ওপিসি) করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত হলে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অ-তালিকাভুক্ত হলে ৪০ শতাংশ কর বহাল থাকছে। মোবাইল অপারেটর এবং তামাক ও সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ কর বহাল থাকবে এবং তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে আরও ২ দশমিক ৫ শতাংশ সারচার্জ প্রযোজ্য হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের জন্য এই হার ১০ শতাংশে সীমিত রাখা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সরকারের লক্ষ্য হলো পর্যায়ক্রমে করের আওতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে করপোরেট করের হার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা। বিশেষ করে, যে খাতগুলো এখন সর্বোচ্চ কর দিচ্ছে, আগামী বছরগুলোতে তাদের করের বোঝা ধাপে ধাপে কমানোর ইঙ্গিত থাকবে এবারের বাজেটে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার সাড়ে ৩২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছিল।
সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি রূপালী চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। তবে তিনি সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির সমালোচনা করে বলেন, করপোরেট কর কমানোর সুফল অনেক সময় রাজস্বের ওপর আরোপিত বাড়তি সম্পূরক শুল্কের কারণে ভেস্তে যায়। এতে ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং আল্টিমেটলি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়। পাশাপাশি কর ফাঁকিবাজদের দমনে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সৎ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশিষ বড়ুয়া দীর্ঘ সময়ের জন্য করহার অপরিবর্তিত রাখার নেতিবাচক দিকটি তুলে ধরেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্বজুড়ে করপোরেট করের হার কমছে। বাংলাদেশ যদি ২০৩০-৩১ করবর্ষ পর্যন্ত অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশে সুনির্দিষ্ট করে রাখে, তবে ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমরা বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে পড়তে পারি। তার মতে, বৈশ্বিক চর্চা অনুযায়ী এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দুই বা তিন বছরের জন্য হওয়া উচিত, যাতে দেশের কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের স্বার্থে কর কাঠামোকে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায়।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজও সরকারের এই উদ্যোগকে নীতিগত ধারাবাহিকতাহীনতার সংকট কাটাতে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে তিনি মনে করেন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড বা ভারতের মতো আঞ্চলিক অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশের করপোরেট কর এবং সার্বিক করের বোঝা এখনও যথেষ্ট বেশি। অগ্রিম আয়কর ও অন্যান্য পরোক্ষ ব্যবস্থার কারণে কার্যকর করের হার অনেক বেড়ে যায়। তাই আগামী দিনে করের এই হারকে আরও যৌক্তিক ও আন্তর্জাতিক মানের করা আবশ্যক।