অর্থবছরের প্রথম আট মাস
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬ ২১:৩১ পিএম
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণছাড় কমেছে ২৬ শতাংশ। সোমবার ইআরডি এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, ঋণছাড়ের এই নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার দীর্ঘদিনের ঘাটতি। এটি একটি নিয়মিত সমস্যারূপে চলে আসছে, যা দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পকে গতি দিতে বাধা সৃষ্টি করছে। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তারা সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততাকে চিহ্নিত করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের এই মনোযোগের বিভাজন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ধীর করে এবং বিদেশি ঋণ সুবিধার যথাযথ ব্যবহারকে ব্যাহত করে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বৈদেশিক সাহায্য ছাড়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের হ্রাস লক্ষ করা গেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় হয়েছিল ৪১৩ কোটি ৪৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। কিন্তু চলতি অর্থবছরে এর পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৩০৫ কোটি ৩০ লাখ ৭০ হাজার ডলারে। অর্থাৎ মাত্র আট মাসেই ঋণছাড়ে ১০৮ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই হ্রাসে ঋণ অংশ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে। অনুদান কিছুটা কমলেও তা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতিও বিশ্লেষণযোগ্য। মোট ঋণের প্রতিশ্রুতি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ছিল ২৩৫ কোটি ৩৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার। বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে প্রতিশ্রুতি এসেছে ২৪৩ কোটি ১০ লাখ ৬০ হাজার ডলার। প্রতিশ্রুতির বৃদ্ধি থাকলেও প্রকৃত ঋণছাড়ের হ্রাস প্রকল্প বাস্তবায়নের অক্ষমতা ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে ঘটেছে।
যদি অনুদান এবং ঋণের প্রতিশ্রুতির ভিন্নতা লক্ষ করা হয়। দেখা যায় ঋণ প্রতিশ্রুতি বেড়েছে, যা ২০৩ কোটি ৮৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৯ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলারে। অপরদিকে অনুদান প্রতিশ্রুতি ৩১ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার থেকে কমে ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ১০ হাজার ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ ঋণ অংশ বেড়েছে, কিন্তু অনুদান কমে যাওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আরও বেড়ে গেছে।
ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। গত অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হয়েছিল ২৬৩ কোটি ৬৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৯ কোটি ৯৭ লাখ ডলারে। এর মধ্যে আসলের পরিশোধ হয়েছে ১৯৪ কোটি ৩৮ লাখ ৬০ হাজার ডলার এবং সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৯৫ কোটি ৫৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৩৯৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা। ঋণ পরিশোধ বৃদ্ধির ফলে সরকারের বার্ষিক বাজেটের ওপর চাপ বেড়েছে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত দায় তৈরি হয়েছে।
ঋণছাড়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। গত আট মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে রাশিয়া, যা ৭৫ কোটি ৫১ লাখ ডলার। এরপর রয়েছে বিশ্বব্যাংক, যা দিয়েছে ৬৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে ৫৬ কোটি ৬১ লাখ ডলার। চীন ও ভারত যথাক্রমে ২৫ কোটি ডলার ও ২৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলার ঋণ ছাড় করেছে। জাপান থেকে এসেছে প্রায় ১৯ কোটি ডলার। অর্থাৎ ঋণছাড়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যর্থতা ঋণের সুফল দেশের নাগরিক পর্যায়ে পৌঁছতে বাধা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলতি অর্থবছরের এই ঋণছাড়ের হ্রাস দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য সতর্কতা সংকেত। প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক সক্ষমতার অভাব বিদেশি ঋণের যথাযথ ব্যবহার ব্যাহত করছে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তারা সতর্ক করে বলছেন, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় সুসংহত পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক সুবিধা অনুপযুক্তভাবে সীমিত থেকে যাবে।