× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

১৫০টি নতুন কূপ খনন : গ্যাস সংকটের কি স্থায়ী সমাধান?

কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:২৩ পিএম

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:২৪ পিএম

২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন কূপ খননের এক উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জ্বালানি বিভাগ। ছবি: এআই

২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন কূপ খননের এক উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জ্বালানি বিভাগ। ছবি: এআই

জ্বালানি বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে। তবে গত কয়েক বছর ধরে তীব্র গ্যাস সংকট শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত স্থবির করে তুলেছে। এই সংকট নিরসনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং জ্বালানি বিভাগ ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন কূপ খননের এক উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কি পারবে দেশের গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে?

জ্বালানি নিরাপত্তার মহাপরিকল্পনার তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র এবং আমদানিকৃত এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ, প্রতিদিন প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। এর ফলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাহিদামতো গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে কমছে। ২০২৩ সালে উৎপাদন ক্ষমতা যেখানে ২ হাজার ৩৩২ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল, ২০২৫ সালে তা কমে ১ হাজার ৮১৯ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞ মতামতে, যদিও ১৫০টি কূপ খননের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫৩০ মিলিয়ন ঘনফুট নতুন গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে সরকার, তবে কিছু বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। প্রথমত, বিদ্যমান খনিগুলোর উৎপাদন যে হারে কমছে, নতুন গ্যাস তার কতটুকু পূরণ করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। দ্বিতীয়ত, আমদানিকৃত এলএনজির ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন করা হবে, যা তিনটি প্রধান ধাপে বিভক্ত করা হয়েছে প্রথম ধাপ (২০২৬-২৭ অর্থবছর) : এই সময়ে ৪৬টি কূপ (৩৮টি নতুন খনন ও ৮টি ওয়ার্কওভার) খনন করা হবে। এখান থেকে আনুমানিক ৬৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর) : এই পর্যায়ে ৬৬টি কূপ (৩৩টি নতুন খনন ও ২৩টি ওয়ার্কওভার) খননের মাধ্যমে আরও ৬৭৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। তৃতীয় ধাপ (২০২৮-৩০ সময়কাল) : অবশিষ্ট ১৭টি কূপ খনন করে আরও ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান করা হবে। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। বর্তমানে বাপেক্সের ৫টি রিগ সচল থাকলেও আরও ২টি শক্তিশালী রিগ (২০০০ অশ্বশক্তি ও ১৫০০ অশ্বশক্তি) ক্রয়ের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

সূত্রের তথ্যানুযায়ী, জ্বালানি খাতের ‘বিশেষ বিধান আইন’ বাতিল হওয়ায় এখন থেকে যেকোনো বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে জিটুজি, পিপিপি অথবা উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ‘মডেল পিএসসি-২০২৬’ চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গ্যাস সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো সিস্টেম লস বা গ্যাস চুরি। বর্তমানে দেশে গ্যাসের সিস্টেম লস প্রায় ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় ৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। এটি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে তিতাস গ্যাসসহ অন্যান্য বিতরণ কোম্পানির জন্য ১৭ লাখ ৫০ হাজার স্মার্ট মিটার স্থাপনের কাজ চলছে। লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সিস্টেম লস ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।

কেবল নিজস্ব উৎপাদন নয়, আমদানিকৃত গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে অবকাঠামো উন্নয়নেও জোর দেওয়া হচ্ছে। মহেশখালীতে চতুর্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) এবং একটি শক্তিশালী ল্যান্ড-বেজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভোলা ও দক্ষিণাঞ্চলের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের কাজও পরিকল্পনায় রয়েছে।

জ্বালানি তেল ও রিফাইনারি নিরাপত্তায় গ্যাসের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে মাত্র একটি রিফাইনারি রয়েছে যার ক্ষমতা মাত্র ১৫ লাখ মেট্রিক টন। অথচ দেশের চাহিদা বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন। এই ঘাটতি মেটাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে নতুন একটি ৩০ লাখ মেট্রিক টন ক্ষমতার রিফাইনারি স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। পাশাপাশি, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনে তেল খালাসের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যা সময় ও ব্যয় দুই-ই কমিয়ে আনবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে প্রণীত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ও আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা সংবলিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, লোডশেডিং যতটা সম্ভব সীমিত রাখতে হবে এবং যদি কোনো লোডশেডিং করতে হয় তা কেবল অপরিহার্য কারিগরি কারণে হতে হবে। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম গ্যাস সংকটের সমাধান নিয়ে বলেন, ১৫০টি কূপ খননের ফলাফল নির্ভর করবে খননের প্রকৃতি ও প্রস্তুতির ওপর। তার মতে, খননকাজ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের মাধ্যমেই হওয়া উচিত এবং স্থলভাগে বিদেশি পক্ষকে খননের অনুমতি সীমিত করা প্রয়োজন। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও নিজস্ব প্রযুক্তিতে পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন না করার পেছনে দুর্নীতিকে দায়ী করেন।

তিনি আরও বলেন, তরল জ্বালানি ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করা উচিত, কারণ এগুলো উৎপাদন কম হলেও উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে ৪৫ শতাংশ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরে চলছে; এটি ৮০ শতাংশ এ উন্নীত করা গেলে তেলভিত্তিক উৎপাদন বা অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির প্রয়োজন কমবে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন এবং খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করার ওপর জোর দেন। তার মতে, শুধু গ্যাস উন্নয়ন দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা