প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:২৯ পিএম
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বৈদেশিক খাতে এক ধরনের দ্বৈত চিত্র ফুটে উঠেছে। পণ্য রপ্তানিতে ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্য ঘাটতির বিস্তার অর্থনীতিতে চাপের সংকেত দিচ্ছে। তবে একই সময়ে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবকে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ধরে রেখেছে। ফলে রপ্তানি খাতের দুর্বলতা আপাতত ঢেকে যাচ্ছে রেমিট্যান্সের শক্তিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্য (বিওপি) সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারে, যা ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ৯৭৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১৭৯ কোটি ডলার। একই সময়ে সেবা বা সার্ভিস খাতেও ঘাটতি বেড়েছে ৫৭ কোটি ডলারের বেশি।
রপ্তানি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্থবছরের শুরুতে আশাব্যঞ্জক প্রবৃদ্ধির পর দ্রুত নিম্নমুখী হয়েছে খাতটি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে রপ্তানিতে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগস্টে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ, অক্টোবরে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ, নভেম্বরে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ।
সংখ্যার হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি হয়েছিল ২ হাজার ২৩২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২১২ কোটি ৪০ লাখ ডলারে। ফলে সামগ্রিকভাবে ছয় মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
রপ্তানি কমলেও আমদানি বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আমদানি ব্যয় ছিল ৩ হাজার ২০৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৬৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারে, যা প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। সামনে রমজান মাসকে কেন্দ্র করে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বৃদ্ধিকে এ ব্যয় বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে রপ্তানি ও আমদানির ব্যবধান বাড়ায় বাণিজ্য ঘাটতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে বড় ধরনের উত্থান বৈদেশিক খাতকে একটি ভিন্ন চিত্র দিয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে প্রবাসী আয় এসেছিল ১ হাজার ৩৭৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬২৬ কোটি ১০ লাখ ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৮ শতাংশের বেশি।
রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যখন ঋণাত্মক, তখন প্রবাসী আয়ের এই প্রবৃদ্ধিই চলতি হিসাবের ঘাটতি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। বাণিজ্য ঘাটতি সত্ত্বেও সার্বিক বিওপিতে প্রথম ছয় মাসে উদ্বৃত্ত রয়েছে ১৯৪ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে ৪৬ কোটি ডলারের ঘাটতি ছিল, সেখানে এবার উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে।
শুধু চলতি হিসাব নয়, আর্থিক হিসাবেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ৫২ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৪ কোটি ডলারে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ, বিদেশি অনুদান ও ঋণপ্রবাহ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও একই সময়ে কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে। বিপিএম৬ হিসাবায়ন পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পণ্য রপ্তানিতে ধারাবাহিক পতন ও বাণিজ্য ঘাটতির বিস্তার অর্থনীতির বহিঃখাতে কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত সামগ্রিক বৈদেশিক ভারসাম্যকে আপাতত টিকিয়ে রেখেছে। ফলে রপ্তানি খাতের দুর্বলতা সরাসরি সংকটে রূপ নিচ্ছে না, বরং রেমিট্যান্সের প্রবাহ তা সাময়িকভাবে ঢেকে রাখছে।