গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৫৩ পিএম
ভূমি ও গৃহহীন পরিবার পুনর্বাসনের নামে আবারও বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে। ব্যর্থ দুই ধাপের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করেই ৭৭০ কোটি টাকার তৃতীয় ধাপের গুচ্ছগ্রাম (ক্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যাবিলিটেশন) প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। কমিশনের প্রাথমিক মূল্যায়নেই উঠে এসেছে প্রকল্পের একাধিক খাতে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে, যা নতুন করে লুটপাটের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ে দুর্বল তদারকির কারণে গুচ্ছগ্রামের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ মুখ থুবড়ে পড়ে। কাজ না করেই ভুয়া বিল দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন, নিম্নমানের টিনে ঘরের ছাদ নির্মাণ, ঋণ বিতরণে অনিয়ম এবং বারবার মেয়াদ বাড়িয়ে ব্যয় ফুলিয়ে তোলার মতো অভিযোগ ছিল আগের প্রকল্পগুলোতে। সেই একই কাঠামো রেখে এবার নতুন প্রকল্পের ডিপিপি পাঠানো হয়েছে, যা কমিশনের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
জানুয়ারিতে পরিকল্পনা কমিশনে মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় ডিপিপির একাধিক খাতে ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। সভা শেষে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব থেকে অধিকাল ভাতা, আনুষঙ্গিক কর্মচারী বিশেষ ভাতাসহ পাঁচটি খাত বাদ দিতে বলা হয় এবং অন্যান্য খাতের ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্গঠনের তাগিদ দেওয়া হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রস্তাবিত ৭৭০ কোটি ৫৫ লাখ টাকার প্রকল্পটির পুরো অর্থই সরকারি তহবিল থেকে আসবে। মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত। পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার ভূমিহীন ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে খাসজমিতে পুনর্বাসনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পে টাইপ ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’Ñতিন ধরনের ঘর নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, খাসজমির দলিল হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
তবে প্রকল্প নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্ষতিপূরণ ভাতায় ৩ কোটি ৩৫ লাখ, আউটসোর্সিংয়ে ১৭ কোটি, নলকূপ স্থাপনে ১২ কোটি, ভ্রমণে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। পাশাপাশি প্রচার ও বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং ডেটাবেস সংরক্ষণেও আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ডিপিপিতে অধিকাল ভাতা, সম্মানী ভাতা ও আপ্যায়ন ব্যয়ের প্রস্তাব থাকলেও এসব খাতের কার্যকারিতা স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে কমিশন। চুক্তিভিত্তিক চারটি গাড়ির জন্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও গাড়ির ধরন উল্লেখ নেই, অথচ আলাদা করে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও ধরা হয়েছে, যা অযৌক্তিক বলে মনে করছেন কমিশনের সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে ভূমি মন্ত্রণালয় বলছে, প্রকল্পের কোনো খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় ধরা হয়নি। তবে ডিপিপির কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তৈরি এই ডিপিপি মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখেই ২০২৪ সালের এপ্রিলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করানো হয়েছে। ফলে বছরভিত্তিক ব্যয় বিভাজনও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
আগের প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা নতুন প্রস্তাবকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে। গুচ্ছগ্রাম প্রথম ধাপে ১৮৭ কোটি টাকায় প্রকল্প অনুমোদন পায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি। মেয়াদ বাড়াতে বাড়াতে শেষ পর্যন্ত ব্যয় হয় ১৮২ কোটি টাকার বেশি। সেখানে পরিবারপ্রতি ঋণ বিতরণ, বৃক্ষরোপণ ও নির্মাণমানÑ সব খানেই লক্ষ্যচ্যুতি দেখা যায়।
দ্বিতীয় ধাপে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। শুরুতে ২৫৮ কোটি টাকায় অনুমোদিত প্রকল্প পরে সংশোধনের মাধ্যমে এক লাফে ৯৪১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। শেষ পর্যন্ত ৯১৭ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। মাঠপর্যায়ে ভুয়া কাগজ তৈরি করে খাদ্যশস্য আত্মসাৎ, অতিরিক্ত দামে পণ্য কিনে শ্রমিক পরিশোধে সরকারি অর্থ ক্ষতি, অনুপযুক্ত স্থানে ঘর নির্মাণে নদীগর্ভে বিলীন হওয়া অবকাঠামো এবং কাজ শেষ না করেই কোটি কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, আদর্শগ্রাম ও গুচ্ছগ্রাম মিলিয়ে ১৯৮৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৩ পরিবারকে পুনর্বাসনের দাবি করা হচ্ছে। তবে বারবার একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে- পুনর্বাসনের নামে এই বিপুল অর্থ আদৌ কতটা টেকসই ঘর গড়ছে, আর কতটা ব্যয় হচ্ছে প্রশাসনিক সুবিধা ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনায়।