প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২০:২৮ পিএম
ঢাকা মহানগর ও আশপাশের এলাকার নদ-নদী, খাল ও জলাশয়ের ক্রমবর্ধমান দূষণ রোধ এবং ভেঙে পড়া স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বাংলাদেশকে ৩৭ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে নির্বাহী পরিচালকদের সভায় এই অর্থায়ন অনুমোদন করা হয়।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক এই কর্মসূচির আওতায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হবে। প্রকল্পটির ঘোষিত লক্ষ্য রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার নদী ও খালের পানি দূষণ কমিয়ে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, নগরবাসীর জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা এবং আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা পাবে এবং প্রায় ৫ লাখ মানুষ আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবার আওতায় আসবে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে সেবা বঞ্চিত ও দূষণপ্রবণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রকল্পের আওতায় বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, রিসাইক্লিং কার্যক্রম আধুনিকায়ন এবং নগরবাসীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কর্মসূচিও থাকবে।
বাংলাদেশ ও ভুটানে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জঁ পেসমে বলেন, ঢাকার নদী ও জলাশয় কোটি মানুষের জীবনরেখা হলেও দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যত ভেঙে পড়েছে। এতে জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তার ভাষায়, এই প্রকল্প ঢাকার নদী ও খালের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে নগরের পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ঢাকার স্যানিটেশন ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র। রাজধানীর মাত্র ২০ শতাংশ বাসিন্দা পাইপযুক্ত স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। বাকি ৮০ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য সরাসরি খাল, জলাশয় ও নদীতে গিয়ে পড়ছে। নগরায়ণের চাপে ঢাকার অর্ধেকের বেশি খাল ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে অথবা বর্জ্যে ভরাট হয়ে রয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিয়মিত দুর্যোগে রূপ নিচ্ছে এবং শুকনো মৌসুমে নদীগুলো কার্যত মৃত হয়ে পড়ছে।
শিল্প দূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার প্রায় ৮০ শতাংশ ঢাকা ও এর আশপাশে অবস্থিত। প্রায় ৭ হাজার শিল্পকারখানা প্রতিদিন আনুমানিক ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নদীতে ফেলছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে আশপাশের বসতিগুলোতে। চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও বিভিন্ন স্নায়বিক জটিলতা বাড়ছে, পাশাপাশি নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় প্রকল্পটিতে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে শিল্পবর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, বিদ্যমান ইটিপি ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো এবং পানির পুনঃব্যবহার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। শিল্পাঞ্চলে দূষণ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ওয়াটার স্পেশালিস্ট ও টাস্ক টিম লিডার হর্ষ গোয়েল জানান, এই কর্মসূচি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। প্রথম ধাপে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নির্দিষ্ট এলাকায় কাজ শুরু হবে। নদীর পানির মান নিয়মিত যাচাইয়ের জন্য চালু করা হবে ডিজিটাল রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা এবং গ্রহণ করা হবে সমন্বিত নদী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা। পাশাপাশি প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, রিসাইক্লিং পদ্ধতির আধুনিকায়ন এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে, যাতে কেউ সরাসরি ড্রেন বা নদীতে বর্জ্য না ফেলে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার পানি ও স্যানিটেশন খাতে বিশ্বব্যাংকের এটি প্রথম প্রকল্প নয়। এর আগেও ওয়াসার সক্ষমতা বাড়াতে এবং স্যুয়ারেজ অবকাঠামো উন্নয়নে একাধিক ঋণ ও অনুদান এসেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ধীরগতি, ভূমি জটিলতা, সমন্বয়হীনতা এবং স্থানীয় সরকারের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক প্রকল্পই কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। রাজধানীর পাগলা ও দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অবকাঠামো তৈরি হলেও সংযোগ লাইনের অভাবে বহু এলাকায় সেবা পৌঁছায়নি।
ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংস্থাটির বিপুল দেনা, জনবল সংকট এবং পুরনো পাইপলাইনের কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ পানি এখনও সিস্টেম লস হিসেবে নষ্ট হচ্ছে। নতুন ঋণনির্ভর প্রকল্পগুলো কার্যকর করতে হলে স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।