প্রধান দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার
আরমান হেকিম
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৫৪ পিএম
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৫৫ পিএম
নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই বলছে দেশকে তারা মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বের করে উন্নত অর্থনীতির পথে নিয়ে যাবে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতের ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে রয়েছে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ ঘিরে উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি। দুই দলই বলছে- দেশকে তারা মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বের করে উন্নত অর্থনীতির পথে নিয়ে যাবে।
বিএনপি যেখানে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে, সেখানে জামায়াত ২০৪০ সালে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ও মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে উন্নীত করার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
যা বলছে বিএনপি
বিএনপির
ইশতেহারে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, বিনিয়োগ
সম্প্রসারণ ও আর্থিক খাত সংস্কারের ওপর। দলটি বলছে, তারা অলিগার্কিক কাঠামো
ভেঙে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করবে, রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয়
ঘটাবে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবে। ইশতেহারে বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিডিপির ২.৫
শতাংশে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ‘এফডিআই
ক্যাপ্টেন’, ২৪ ঘণ্টার হেল্পডেস্ক,
ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট সহজীকরণ, মুনাফা
প্রত্যাবাসনে হয়রানি বন্ধ এবং বিডায় পূর্ণাঙ্গ সিঙ্গেল উইন্ডো চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া
হয়েছে।
ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, বাংলাদেশ
ব্যাংকের ক্ষমতায়ন ঘটানো,
ব্যাংকিং ডিভিশন বিলুপ্তি, খেলাপি ঋণ সমাধান ও
অবসায়িত ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরতের মতো কঠিন সংস্কারও বিএনপির ইশতেহারে আছে।
পুঁজিবাজারে ব্লকচেইন প্রযুক্তি, ডিজিটাল আইপিও, করপোরেট
বন্ড ও সুকুক চালু,
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার মতো প্রস্তাবও
অনেকটা বিস্তারিতভাবেই সংযুক্ত হয়েছে এতে।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে গুরুত্বারোপ: প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনায় বিএনপি তার
ইশতেহারে আরও একধাপ এগিয়ে রয়েছে। এআই ও হার্ডওয়্যার হাব, পে-পাল
চালু, জাতীয় ই-ওয়ালেট,
এজ ডাটা সেন্টার ক্যাম্পাস, ৯৯.৯৯৯ শতাংশ
নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট,
সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র এবং স্টার্টআপে ১০ বছরের কর
সুবিধার মতো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। পাশাপাশি সাইবার সিকিউরিটি ও এআইসহ পাঁচ
খাতে দুই লাখ এবং ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনে আট লাখÑ মোট ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের
লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে এ দল।
রাজস্ব বাড়াতে বিএনপি বলছেÑ ভ্যাট সমন্বয়, তামাক
ও দূষণকারী জ্বালানিতে কর আরোপ করে জিডিপির অতিরিক্ত ২ শতাংশ রাজস্ব আদায় করা হবে।
প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে মধ্যমেয়াদে রাজস্ব ১০ শতাংশ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
উচ্চবিত্তদের করজালে আনা,
ডিজিটাল অডিট, বৈষম্যমূলক কর ছাড় বাতিল এবং
মেগা প্রকল্পে সংসদীয় নজরদারি বাধ্যতামূলক করার অঙ্গীকার রয়েছে বিএনপির।
যা বলছে জামায়াত
এর
বিপরীতে জামায়াতের ইশতেহার তুলনামূলকভাবে বেশ খানিকটা জ্বালানি, শিল্প
ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক। দলটি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বাপেক্স
ও পিডিবির সক্ষমতা বৃদ্ধি,
সৌরবিদ্যুৎ ১০ গুণ বাড়ানো, কয়লার সীমিত ব্যবহার
এবং কুইক রেন্টাল বন্ধের কথা বলেছে। ২০৪০ সালে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, জিডিপি
প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত করা, কর আদায় জিডিপির ১৪ শতাংশে নেওয়া এবং
সরকারি ব্যয় ২০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছে জামায়াত।
জামায়াত করপোরেট কর ২০ শতাংশের নিচে নামানো, করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ লাখ টাকা করা এবং বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলেছে। ব্যাংক খাতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ কমানো, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং শেয়ারবাজার কারসাজির বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও রয়েছে তাদের। রপ্তানি পাঁচ বছরে দ্বিগুণ করা, এফডিআই ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং বছরে ৫০ লাখ যুবকের বিদেশে কর্মসংস্থানের মতো বড় লক্ষ্যও ইশতেহারে তুলে ধরা হয়েছে।
কর্মসংস্থানে জামায়াত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান অফিস, কর্মবীমা, বেকার ভাতা, জাতীয় ওয়ার্কফোর্স ডাটাবেজ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় জাকাত সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছে। শিল্পখাতে তারা ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন, গাড়ি শিল্প, ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাট ও চামড়া শিল্প আধুনিকায়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেছে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদ্যমান মানি লন্ডারিং আইনসহ আর্থিক খাতের অন্যান্য আইনের সংস্কার, শেয়ারবাজারে কারসাজি বন্ধ এবং কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার কথাও রয়েছে জামায়াতের ইশতেহারে।
জামায়াত বিনিয়োগ গতিশীল করতে ইনভেস্টমেন্ট বন্ড মার্কেট গড়ে
তোলার কথা বলেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক
প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর এবং অলাভজনক শিল্পের জায়গায় প্রয়োজনে নতুন শিল্প স্থাপনের
পরিকল্পনা দিয়েছে। সরকারি ক্রয় ও টেন্ডারে স্মার্ট কন্ট্রাক্টভিত্তিক স্বচ্ছ
ব্যবস্থা চালু,
কাস্টমস ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন এবং ফ্যাক্টরি
গেট কন্টেইনার সিলিং চালুর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
বড় একটি মিল
দুই দলের ইশতেহারেই বড়
একটি মিল হলো- উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়রেখা, অর্থায়নের
উৎস এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট নয়। বিএনপি ট্রিলিয়ন ডলারের
অর্থনীতির কথা বললেও বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার। মাত্র
আট-নয় বছরে দ্বিগুণের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনে গড় প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের ওপরে রাখতে
হবে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর বাস্তবতায় অত্যন্ত কঠিন। একইভাবে জামায়াতের দুই
ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনে লাগবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাপক
বিদেশি বিনিয়োগ এবং শক্তিশালী শিল্পায়ন- যার কোনো বাস্তব রোডম্যাপ ইশতেহারে নেই।
লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়
রাজস্ব
আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাত সংস্কার,
খেলাপি ঋণ কমানো কিংবা পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা- এসবই রাজনৈতিকভাবে
স্পর্শকাতর ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জটিল বিষয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শক্তিশালী
স্বার্থগোষ্ঠীর কারণে এসব সংস্কার বারবার থমকে গেছে। বিএনপি অলিগার্কিক কাঠামো
ভাঙার কথা বললেও সেই অলিগার্কদের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে কীভাবে মোকাবিলা করবে, তার
সুস্পষ্ট কৌশল দেয়নি। জামায়াতও দুর্নীতি ও কারসাজি বন্ধের অঙ্গীকার করেছে, কিন্তু
প্রয়োগযোগ্য আইনগত কাঠামোর বিস্তারিত নেই।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও দুই দলের প্রতিশ্রুতি বড় হলেও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ছাড়া এসব সংখ্যা বাস্তবে নামানো কঠিন। বিএনপির ডিজিটাল ও এআই-কেন্দ্রিক কর্মসংস্থান পরিকল্পনা গ্রামীণ ও স্বল্পশিক্ষিত শ্রমশক্তির জন্য কতটা কার্যকর হবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। জামায়াতের বছরে ৫০ লাখ বিদেশি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে বৈশ্বিক শ্রমবাজার, ভাষা দক্ষতা ও অভিবাসন ব্যয়ের মতো বাস্তব সীমাবদ্ধতা বড় বাধা।
সব মিলিয়ে বিএনপির ইশতেহার বেশি নীতিনির্ভর ও প্রযুক্তিমুখী, জামায়াতের
ইশতেহার বেশি খাতভিত্তিক ও কর্মসংস্থান-কেন্দ্রিক। কিন্তু দুই দলই মূল প্রশ্নটির
উত্তর পরিষ্কারভাবে দেয়নি- রাষ্ট্রের বর্তমান দুর্বল প্রতিষ্ঠান, রাজস্ব
ঘাটতি, ব্যাংক খাতের সংকট ও বিনিয়োগ স্থবিরতার বাস্তবতায় এসব প্রতিশ্রুতি কীভাবে
বাস্তবায়ন হবে। ফলে ভোটারদের সামনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- এগুলো কি সত্যিকারের অর্থনৈতিক
রূপান্তরের রূপরেখা,
নাকি নির্বাচনি মৌসুমের আরেক দফা ফাঁকা আওয়াজ?