আরমান হেকিম
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:১১ পিএম
বিদেশি ঋণের বোঝা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের অঙ্ক দ্বিগুণ হওয়ায় অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন বিদেশি ঋণ গ্রহণে সরকার সতর্ক হলেও সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। কোনো ধরনের পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই বিদেশি ঋণভিত্তিক প্রকল্প নিয়েছে সংস্থাটি। এরফলে এক হাজার ৩২১ কোটি টাকার বেশি ব্যয় গচ্চা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন ঝুঁকি বিবেচনায় প্রকল্পটি ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক। অথচ প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে ব্যয় হাজার কোটি টাকা ছাড়ালেও সেই সমীক্ষা করা হয়নি। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যেসব উন্নয়ন প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে, তার সিংহভাগ ক্ষেত্রেই সমীক্ষা দুর্বল ছিল বা আদৌ করা হয়নি। একই কারণে এই প্রকল্পেও অর্থ অপচয়ের বড় ঝুঁকি রয়েছে বলে মত দিয়েছে কমিশন।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ‘প্রজেক্ট ফর এস্টাবলিশিং ইকো-ফ্রেন্ডলি স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইন চট্টগ্রাম সিটি’ শীর্ষক প্রকল্পটি নিয়ে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প পর্যালোচনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্পটির কাঠামো, অর্থায়ন ও প্রস্তুতিমূলক কাজ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহামদ।
পর্যালোচনা সভায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষে নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের নমনীয় ঋণের আওতায় ১২ কোটি ১২ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় এক হাজার ৩২১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম নগরের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব নতুন স্যানিটারি ল্যান্ডফিল স্থাপন, বিদ্যমান দুটি অস্বাস্থ্যকর ডাম্পিং সাইট বন্ধ এবং সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে পুনরুদ্ধারযোগ্য উপাদান সংগ্রহ ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে ল্যান্ডফিলে জমা হওয়া বর্জ্যের পরিমাণ কমানোর লক্ষ্যও তুলে ধরেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে কবির আহামদ বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা এবং একটি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। তবে তিনি জানতে চান, এত বড় ব্যয়ের প্রকল্পের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে কি না।
এ প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে কোরিয়া এনভায়রনমেন্টাল ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে একটি প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে হালিশহর ও আরেফিন নগরের অস্বাস্থ্যকর ডাম্পিং সাইট বন্ধ করে নতুন স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে প্রস্তাব পাঠায়। ইআরডি ওই প্রস্তাব দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছে এক কোটি ২৯ লাখ ডলার অনুদানের জন্য পাঠালেও এখনও কোনো চূড়ান্ত সাড়া পাওয়া যায়নি। সভায় বলা হয়, নীতিগত অনুমোদন পেলে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও মূল প্রকল্পের ঋণ একই সঙ্গে প্রক্রিয়াকরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পর্যালোচনা সভায় ভৌত অবকাঠামো বিভাগের উপপ্রধান দেবোত্তম সান্যাল বলেন, সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা ২০২২ অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রতিটি বিনিয়োগ প্রকল্পের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অপরিহার্য। পিডিপিপিতে কোরিয়ান সরকারের পক্ষ থেকে সমীক্ষা করার কথা উল্লেখ থাকলেও স্থানীয় বাস্তবতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় ব্যবহারকারীদের অভ্যাস ও মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় নিয়ে কোনো সমীক্ষা হয়নি, যা বড় ধরনের ঘাটতি।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব আইরিন পারভীন সভায় বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ পেতে হলে উদ্যোগী মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব সম্ভাব্যতা সমীক্ষা থাকা প্রয়োজন। তবে এই প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার সম্ভাব্যতা সমীক্ষার অনুদান এবং মূল প্রকল্পের নমনীয় ঋণ একই প্যাকেজে দেওয়ার শর্ত আরোপ করায় প্রক্রিয়াগত জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবু চট্টগ্রামের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের প্রয়োজন বিবেচনায় পিডিপিপির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে বলে তিনি মত দেন।
পরিকল্পনা কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মূল প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাধ্যতামূলকভাবে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে এবং সেই সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রকল্পের নকশা ও কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করতে হবে। একই সঙ্গে জনস্বার্থ বিবেচনায় সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য অনুদান এবং মূল প্রকল্পের জন্য নমনীয় ঋণ পাওয়ার লক্ষ্যে পিডিপিপি নীতিগত অনুমোদনের পর ইআরডিতে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছে।