প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৫০ পিএম
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৫০ পিএম
জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার জন্য যে প্রকল্পকে কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিল, বাস্তবে সেটিই এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। সারা দেশে ১৯৫টি নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকল্প শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের যাচাই যথাযথভাবে না করায় বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে একের পর এক বাধার মুখে পড়ছে কর্মসূচিটি। সময় গড়ালেও কাজ এগোয়নি, বরং ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে।
এমন চিত্র ‘দেশের কৌশলগত স্থানে নতুন খাদ্যগুদাম ও আনুষাঙ্গিক সুবিধাদি নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্পটি অনুমোদনের পর দুই বছর পার হলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনও ৬ শতাংশের নিচে। পরিকল্পনা অনুযায়ী যে গুদামগুলো ইতোমধ্যে নির্মাণ পর্যায়ে থাকার কথা ছিল, সেগুলোর অনেক জায়গাতেই এখনও কাজ শুরু হয়নি। কোথাও জায়গা সংকট, কোথাও জমি সংক্রান্ত জটিলতা, আবার কোথাও অবকাঠামোগত প্রস্তুতির অভাব প্রকল্পের গতি কার্যত থামিয়ে দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। গত ২১ ডিসেম্বর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রস্তাবটি পর্যালোচনার সময় একাধিক প্রশ্ন ও আপত্তি ওঠে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্প অনুমোদনের সময় যেসব তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, বাস্তব অবস্থার সঙ্গে তার মিল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কিছু সুপারিশসহ প্রস্তাবটি ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সাবেক সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন মনে করেন, এই পরিস্থিতির মূল কারণ প্রকল্প গ্রহণের শুরুতেই দুর্বল প্রস্তুতি। তার মতে, প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে যে ধরনের বিশদ ও বাস্তবসম্মত সমীক্ষা প্রয়োজন ছিল, তা করা হয়নি। এর ফলেই বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে জমি, অবস্থান ও অবকাঠামো নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, জমিসংক্রান্ত সমস্যাই এখানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আগেভাগে যাচাই করা হলে এড়ানো সম্ভব ছিল।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনীর প্রস্তাবে ব্যয় বাড়িয়ে ৮৫৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। প্রাথমিকভাবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও এখন তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অগ্রগতির হিসাব আরও স্পষ্টভাবে প্রকল্পের দুরবস্থা তুলে ধরে। প্রকল্প শুরুর পর থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা, যা অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় খুবই সামান্য। আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশে আটকে আছে। খাদ্য অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকলেও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির ঘাটতি শুরু থেকেই স্পষ্ট।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনেক জায়গায় নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণের জন্য যে স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো ছিল অথবা পর্যাপ্ত খালি জায়গা পাওয়া যায়নি। কোথাও আবার বড় গাছপালা ও পুরনো স্থাপনা অপসারণ না করেই ডিপিপিতে স্থান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরে বাস্তবে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে নির্মাণ সম্ভব নয়। ফলে একাধিক স্থানে গুদামের অবস্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
যশোরসহ কয়েকটি এলাকায় জমির শ্রেণি নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়েছে। তিন ফসলি জমিতে গুদাম নির্মাণের সিদ্ধান্তে আপত্তি ওঠায় নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এতে সময় বাড়ার পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়ছে। এসব বিষয় প্রকল্প প্রস্তাবের সময় বিবেচনায় না নেওয়ায় এখন পুরো কর্মসূচি পুনর্বিন্যাসের চাপ তৈরি হয়েছে।
সংশোধনী প্রস্তাবে সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত লক্ষ্যগুলো নতুন করে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা একটি জনবহুল দেশ। দুর্যোগকালীন সময়ে দ্রুত খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত ও আধুনিক খাদ্যগুদাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে খাদ্য বিভাগের অধীনে থাকা গুদাম ও সাইলো মিলিয়ে খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা প্রায় ২১ দশমিক ৮০ লাখ টন, যা ধাপে ধাপে ৩৭ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, পুরনো ও জরাজীর্ণ গুদামগুলো অপসারণ করে নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়বে। একই সঙ্গে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। প্রকল্পের আওতায় ১৯৫টি খাদ্যগুদাম নির্মাণের পাশাপাশি অফিস কাম ডরমেটরি ভবন, সংযোগ সড়ক, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও যান্ত্রিক সুবিধা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। জরুরি খাদ্য নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও দায়সারা সমীক্ষার ফল হিসেবে প্রকল্পটি এখন সময় ও ব্যয়ের চাপে পড়েছে। কৌশলগত খাদ্য মজুদের যে লক্ষ্য নিয়ে উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছিল, সেটি পূরণে কাঠামোগত দুর্বলতাই বড় বাধা হয়ে উঠছে।