× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জনতা ব্যাংক

কল্যাণ সমিতির ছদ্মবেশে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:০৮ পিএম

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:২৭ পিএম

কল্যাণ সমিতির ছদ্মবেশে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক জনতা ব্যাংক পিএলসিতে একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক প্রশাসন কার্যত জিম্মি করে রাখার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অফিসার কল্যাণ সমিতি ও একটি বিশেষ রাজনৈতিক ঘরানার নাম ব্যবহার করে এই গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন এবং বোর্ড ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ করে আসছে।

সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো এক লিখিত অভিযোগে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অন্যায় দাবি পূরণে বোর্ডসভায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অবরুদ্ধ করে রাখার মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে। এতে শুধু প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাই নয়; বরং একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামো কীভাবে সংগঠিত চাপ ও ভয়ভীতির মাধ্যমে ভেঙে পড়ছে- তার নগ্ন চিত্র তুলে ধরে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে ব্যাংকের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এটি শুধু অসদাচরণ নয়, এটি ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এ প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এ বিষয়ে তদন্তের জন্য কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। 

জানা যায়, জনতা ব্যাংক দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক। বিগত এক দশকে খেলাপি ঋণ, বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে ব্যাংকটি একাধিকবার আলোচনায় এসেছে। অতীতের সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একটি গোষ্ঠী ‘কল্যাণ সমিতি’র ব্যানারে প্রভাব বিস্তার করছে। বদলি ও পদোন্নতির আশ্বাস দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, প্রশাসনের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে এই গোষ্ঠী।

বোর্ডসভা ঘেরাওয়ে নজিরবিহীন প্রশাসনিক বিপর্যয় : জানা গেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও প্রধান কার্যালয়ের বোর্ডসভা চলাকালে একদল কর্মকর্তা বোর্ডরুম ঘেরাও করেন। তারা স্লোগান, অশ্রাব্য ভাষা ও হুমকির মাধ্যমে বোর্ড সদস্যদের কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখেন। রাত ১০-১১টা পর্যন্ত দুই সদস্য সভাকক্ষ থেকে বের হতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে একজন বোর্ড সদস্য কোনো প্রতিকার না পেয়ে পদত্যাগ করেন। আরেকজন সদস্য যিনি সাবেক জেলা জজ শারীরিক লাঞ্ছনার আশঙ্কায় পরবর্তীতে আর বোর্ডে যোগ দেননি। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ইতিহাসে বোর্ড সভা এভাবে জিম্মি করার ঘটনা বিরল ও অভূতপূর্ব।

৮০০ পদ সৃষ্টিতে অনিয়মের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ : এই চাপেরই ধারাবাহিকতায় প্রায় ৮০০টি সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি দিতে ব্যবস্থাপনাকে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এই অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি ও পদোন্নতিকে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাখ্যা তলব করা হয়। অন্যদিকে জনতা ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) পদে সাম্প্রতিক পদোন্নতি ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। একটি রাজনৈতিক দলের লেজুড় ব্যাংকের এই্ সংগঠনের নাম ব্যবহার করে জনপ্রতি ১০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। হিসাব করলে মোট লেনদেনের অঙ্ক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা বিষয়টি জানতে পেরে জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পাঁচজন সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসারকে পদোন্নতির সুপারিশ করলে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় বিদায়ি বছরের ৩০ ডিসেম্বর বোর্ডসভা চলাকালে আবারও হট্টগোলের সৃষ্টি করা হয়। বোর্ডরুমে জোরপূর্বক প্রবেশ করে স্লোগান ও বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি করা হয়। ব্যাংকের চেয়ারম্যান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও তাতে তিনি সফল হননি। তা ছাড়া ওই দিনটি প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার তিরোধান দিবস হওয়ায় শোক পালনের অনুরোধ জানানো হলেও তা উপেক্ষা করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, শূন্যপদ ছাড়া এত বিপুলসংখ্যক পদ সৃষ্টি মানে শুধু আর্থিক চাপ নয়, এটি একটি ব্যাংকের মানবসম্পদ কাঠামোকে ধ্বংস করে দেয়। এর দায় শেষ পর্যন্ত করদাতাদের ঘাড়েই পড়ে।

রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার ও সংখ্যালঘু আতঙ্ক : জানা গেছে, নিজেদের কর্মকাণ্ড ঢাকতে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যাংকের ভেতর ও বাইরে ব্যানার-ফেস্টুন টানানো, সংসদ সদস্য প্রার্থীর নাম ব্যবহার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে উস্কানিমূলক স্লোগানের অভিযোগও এসেছে। এতে ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে উস্কানিমূলক স্লোগানের অভিযোগও রয়েছে, যা ব্যাংকের ভেতরে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘু কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হুমকি বা বিদ্বেষমূলক আচরণ সাংবিধানিক মূল্যবোধের সরাসরি লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট শুধু জনতা ব্যাংকের নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। কঠোর তদন্ত, অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত, শাস্তিমূলক বদলি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না।

তাদের মতে, দায়ীদের বিরুদ্ধে চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী তদন্ত, আইনগত ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে দূরবর্তী স্থানে বদলি করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সুশাসন ফেরাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ, স্বচ্ছ পদোন্নতি ব্যবস্থা এবং জিরো টলারেন্স নীতি ছাড়া বিকল্প নেই। যদি এখনই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে অন্য ব্যাংকগুলোতেও একই সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়বে। এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. মজিবুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। তবে সেই দিনের ঘটনাটি ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। সুস্থ হলেই সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সার্বিক বিষয়ে অবহিত করা হবে। 

এ বিষয়ে জনতা ব্যাংক অফিসার্স কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আগের নীতিমালা আলোকে বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠরা পদোন্নতি পেয়েছে। এবারও সেই পথ অনুসরণ করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পদোন্নতির চেষ্টা করা হয়। এটি বন্ধ রাখতে বোর্ডকে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বলা হয়Ñ বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঞ্চিতদের পদোন্নতির জন্য বিবেচনায় আনতে হবে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কথা দিলেও তা আমলে নেয়নি। তিনি আরও বলেন, কল্যাণ সমিতির নামে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি করা হয়নি। এমনকি পদোন্নতির জন্য বোর্ডসভা অবরুদ্ধ করে সিদ্ধান্ত আদায়ের কোনো ঘটনাও ঘটেনি। একটি পক্ষ তাদের বিরুদ্ধে অসত্য ও মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা