প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:৩৭ পিএম
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ঘুরে দাড়িয়েছে অর্থনীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সাময়িক হিসাব বলছে, স্থির মূল্যে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪.৫০ শতাংশে। এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে এই প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রথম প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি কার্যত প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বিবিএসের প্রতিবেদেনে দেখা যায়, চলতি মূল্যে হিসাব করলে জিডিপির আকারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে চলতি মূল্যে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৩ বিলিয়ন টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ১২ হাজার ৪০১ বিলিয়ন টাকা।
বিবিএসের ত্রৈমাসিকভিত্তিক প্রাক্কলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থির মূল্যে মোট দেশজ উত্পাদনের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৩.৭২ শতাংশে। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রাক্কলিত হিসাবের সঙ্গে বাত্সরিক ভিত্তিতে প্রকাশিত সাময়িক জিডিপি হিসাবের পার্থক্য রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাত্সরিক জিডিপি চূড়ান্ত করার পর আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত পদ্ধতিতে বেঞ্চমার্কিংয়ের মাধ্যমে এই পার্থক্য সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ বর্তমান সংখ্যাগুলোকে চূড়ান্ত ধরা না হলেও এগুলো অর্থনীতির তাৎক্ষণিক গতিপ্রকৃতি বোঝায় গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন ২০২৫) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে শিল্প খাত। স্থির মূল্যে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৯৭ শতাংশ।
এক বছর আগে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। উৎপাদন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি সরবরাহ, নির্মাণসহ শিল্প খাতের বিভিন্ন উপখাতে এই গতি অর্থনীতির সার্বিক পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখছে।
কৃষি খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে স্থির মূল্যে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.৩০ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক, অর্থাৎ মাইনাস ০.৬০ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে কৃষি খাতের এই ঘুরে দাঁড়ানো গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য আবহাওয়া পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নতি কৃষি খাতের এই ইতিবাচক প্রবণতায় ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সেবা খাতেও প্রবৃদ্ধির গতি বেড়েছে, যদিও শিল্পের মতো এতোবেশি নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৬৭ শতাংশ, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৯৬ শতাংশ। বাণিজ্য, পরিবহন, যোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও অন্যান্য সেবা কার্যক্রমে ধীরে ধীরে চাহিদা বাড়ার প্রতিফলন হিসেবে এই উন্নতি দেখা যাচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরম্নরি। প্রথম কোয়ার্টারের এই ইতিবাচক গতি পুরো অর্থবছর জুড়ে টেকসই হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নীতি সহায়তা, বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিস্থিতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর। এই গতি ধরে রাখা গেলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রত্যাশাও বাড়বে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি সরকার সময়োপযোগী সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৬ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাত সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিবেশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।