হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:২০ পিএম
পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে বস্ত্র অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নেয় চট্টগ্রাম নগরীর সাগরিকা রোডের বিসিক শিল্প নগরীর ফেলিক্স ফ্যাশনস লিমিটেড। শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক তৈরির জন্য ওই প্রতিষ্ঠানটি কারখানায় বিনিয়োগ করে ৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। শুধু ফেলিক্স ফ্যাশনস লিমিটেড নয়, বস্ত্র অধিদপ্তর থেকে ২০২১ সালে চট্টগ্রামের আরও ১৩টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন নেয়। ওই বছর ১৪টি প্রতিষ্ঠানে সব মিলিয়ে বিনিয়োগ করা হয় ২০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
কারখানার নিবন্ধন তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রামে বস্ত্র খাতে মাত্র ২০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ হলেও বছর বছর এটি বেড়েছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রামে বস্ত্র খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৯৯ গুণ। পাঁচ বছর আগে এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ২০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৯৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে গত ৫ বছরে চট্টগ্রামে ১৫৬টি কারখানা বস্ত্র অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন সনদ নিয়েছে। এই ১৫৬ প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সনদে বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই কারণে এই বিনিয়োগ বাড়ছে। প্রথমত পরিবর্তিত সময়ে ২০২৫ সালে চট্টগ্রামে নতুন করে কিছু কারখানা চালু হয়েছে। অন্যদিকে বস্ত্র অধিদপ্তরের কড়াকড়ির কারণে বিদ্যমান কিছু প্রতিষ্ঠানও নিবন্ধন নিতে বাধ্য হয়েছে। যে কারণে ২০২৫ সালে চট্টগ্রামে বস্ত্র খাতে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বেড়েছে। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন বিনিয়োগ বাড়ছে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বস্ত্র অধিদপ্তর বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আলী আহাব রাখা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নিবন্ধন সনদ অনুযায়ী বিনিয়োগ বছর বছর বাড়ছে। কিছু কিছু কারখানা আগেই চালু ছিল। বস্ত্র অধিদপ্তর থেকে আগে নিবন্ধন না নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো যেই বছর নিবন্ধন সনদ নিয়েছে ওই বছর বিনিয়োগ তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে বাস্তবে চট্টগ্রামে বস্ত্র খাতে বিনিয়োগ এর চেয়ে অনেক বেশি। কারণ এখনও অনেক কারখানা বস্ত্র অধিদপ্তরের নিবন্ধন নেয়নি। ওইসব কারখানা নিবন্ধনের আওতায় এলে মূল বিনিয়োগের চিত্র পাওয়া যাবে।’
বস্ত্রসহ কৃত্রিম, বিশেষায়িত যান্ত্রিক তাঁত পণ্যের আভ্যন্তরীণ ও বহিঃবিপণনের সমন্বয় সাধন এবং এর পরিবহন ও জাহাজীকরণের কাজ করে বস্ত্র অধিদপ্তর। নিয়ম অনুযায়ী, দেশের বস্ত্র খাতের সকল প্রতিষ্ঠানকে এই অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। বস্ত্র অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রামে বস্ত্র অধিদপ্তরের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান আছে ২৪৩টি। এর মধ্যে ৪১টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন নিয়েছে ২০২৫ সালে।
সংস্থাটির নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ৫ বছর ধরে চট্টগ্রামে ধারাবাহিকভাবে বস্ত্র খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। নিবন্ধন তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে যেখানে ২০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়। সেখানে ২০২২ সালে চট্টগ্রামে এই খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ৫৪৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানই বিনিয়োগ করেছে ৪২৪ কোটি টাকা। এরপর ২০২৩ সালে বিনিয়োগ কিছুটা কমে যায়। ওই বছর চট্টগ্রামে বস্ত্রখাতে বিনিয়োগ হয় ৩৩৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৮৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে একটি প্রতিষ্ঠান। এরপর চট্টগ্রামে আবারও বস্ত্র খাতে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে বিনিয়োগ হয় ১ হাজার ৮৬৫ কোটি ২২ লাখ টাকা। আর সর্বশেষ ২০২৫ সালে বিনিয়োগ হয় ১ হাজার ৯৯৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৯৬২ কোটি ১৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে একটি প্রতিষ্ঠান।
শুধু বিনিয়োগ বাড়ছে এমন নয়, বছর বছর চট্টগ্রামে বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের সংখ্যাও বাড়ছে। বস্ত্র অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে চট্টগ্রামে মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন নেয়। সেখানে এর পরের বছর নিবন্ধন নিয়েছে ৪১টি প্রতিষ্ঠান। এর পরের দুই বছর কারখানার নিবন্ধন কিছুটা কমে যায়। ২০২৩ সালে চট্টগ্রামে বস্ত্রখাতের ৩৪টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন সনদ নেয়। এর পরের বছর ২০২৪ সালে নিবন্ধন সনদ নেয় ২৬টি প্রতিষ্ঠান। আর সর্বশেষ ২০২৫ সালে বস্ত্র অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিয়েছে চট্টগ্রামের ৪১টি প্রতিষ্ঠান।
‘জাতীয় বস্ত্র দিবস-২০২৫’ উদযাপন উপলক্ষে এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছিলেন, ‘দেশের বস্ত্র খাত এখন শুধু একটা শিল্প নয়, বরং অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এ শিল্প দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে বিরাট ভূমিকা রাখছে। আমরা ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি অর্জন করতে চাই। এ লক্ষ্য পূরণে শিল্প, একাডেমিয়া ও নীতিনির্ধারকদের একত্রে কাজ করতে হবে। সক্ষমতা বৃদ্ধি না করতে পারলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে পারে।’
পাট শিল্পে অতীতে যে ভুল হয়েছে, বস্ত্র খাতে সেই ভুল পুনরায় না করার আশ্বাস দিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আবেগের বশবর্তী হয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। আমাদের সিদ্ধান্ত হবে বাস্তবতার নিরিখে। শিল্পের অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে যেতে চাই। পাট খাতের ভুলের পুনরাবৃত্তি বস্ত্র খাতে হবে না। পাট শিল্পে অতীতে অদক্ষতা, অযোগ্যতা, দুর্বৃত্তায়ন ও অব্যবস্থাপনার কারণে শিল্পটি ধ্বংসের মুখে পড়েছে। রঙিন স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। কিছু অর্জন করতে না পেরেই স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল।’