প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৪৯ পিএম
আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৫৫ পিএম
কারাকাসের রাস্তায় ভেনেজুয়েলার পতাকা ও তেলের পাম্প সংবলিত একটি দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে মাস্ক পরা এক ব্যক্তি হেঁটে যাচ্ছেন। ২০২২ সালের মে মাসে তোলা এএফপির ছবি।
ভেনেজুয়েলার তেলের
ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া সাম্প্রতিক পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতিতে
রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, তারা ভেনেজুয়েলাকে রাজি করিয়েছে
যাতে বেইজিংয়ে তেল না পাঠিয়ে সেই তেল যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। প্রায় ২০০ কোটি ডলার
সমমূল্যের এই তেলের চুক্তি নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে টানটান উত্তেজনা। এই অস্থিরতার মধ্যে
বুধবার অপরিশোধিত তেলের দাম ১ শতাংশ কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ‘গুণ্ডামি’
করছে: অভিযোগ চীনের
যুক্তরাষ্ট্রের এই
পদক্ষেপে সবচেয়ে বেশি চটেছে চীন। এতদিন ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল তারা।
বেইজিং এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘দাদাগিরি’ বা গুন্ডামি বলে আখ্যা দিয়েছে বলে বার্তা
সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
মুখপাত্র মাও নিং সরাসরি বলেছেন, “ভেনেজুয়েলা একটা স্বাধীন দেশ। নিজেদের তেল তারা কাকে
দেবে, সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র জোর খাটিয়ে তাদের ওপর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’
নীতি চাপাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।” চীন পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, ভেনেজুয়েলার
সঙ্গে তাদের বৈধ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে এবং তা রক্ষার অধিকার তাদের আছে।
ট্রাম্পের হুঙ্কার:
‘তেলের টাকা থাকবে আমার হাতে’
ডোনাল্ড ট্রাম্প
ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে নিজের পরিকল্পনা নিয়ে একদম লুকোছাপা করছেন না। গত মঙ্গলবার তিনি
একটি পোস্টে লেখেন, “এই তেলের টাকা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সরাসরি আমার নিয়ন্ত্রণে
থাকবে। আমি নিশ্চিত করব যাতে এই টাকা ভেনেজুয়েলা আর আমেরিকার মানুষের উপকারে লাগে।”
তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলায় আটকে থাকা প্রায় ৫ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্র
পরিষ্কার করে বাজারে ছাড়বে।
বিশ্ববাজারে তেলের
দাম ও বিনিয়োগের শঙ্কা
ভেনেজুয়েলা থেকে
বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে আসার সম্ভাবনায় বুধবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায়
১ শতাংশ কমে গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাজটা এত সহজ নয়। ট্রাম্প চাইছেন ৩-৫ কোটি
ব্যারেল তেল দ্রুত আনতে, কিন্তু হিসাব বলছে বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে এটা করতে প্রায় ২
হাজার দিন সময় লেগে যেতে পারে। এছাড়া শেভরনের মতো মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো এখনই বড়
বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছে। তারা আগে ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত দেখতে
চায়।
এদিকে চীন ২০২৫ সালে
প্রতিদিন ৩ লাখ ৮৯ হাজার ব্যারেল করে অপরিশোধিত তেল ভেনেজুয়েলা থেকে আমদানি করে, যা
সমুদ্রপথের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৪ শতাংশ। এখন তারা ইরান বা রাশিয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে।
পরিবেশের জন্য বড়
বিপদ ‘নোংরা তেল’
ট্রাম্পের পরিকল্পনায়
পরিবেশবাদীরা বেশ আতঙ্কিত। ভেনেজুয়েলার তেলকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম ‘নোংরা’ তেল। এই
তেল অত্যন্ত ঘন এবং এতে সালফারের পরিমাণ অনেক বেশি। এই তেল পরিশোধন করা সাধারণ তেলের
চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও ব্যয়বহুল।
পরিবেশবাদীরা বলছে,
ভেনেজুয়েলায় তেল উত্তোলনের সময় যে পরিমাণ মিথেন গ্যাস নির্গত হয়, তা বিশ্বের গড় হারের
চেয়ে ছয় গুণ বেশি। দেশটির তেলের পাইপলাইন আর যন্ত্রপাতি এতটাই পুরানো যে প্রায়ই তেল
চুইয়ে পরিবেশের ক্ষতি হয়। ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যেই প্রায় ১৯৯টি বড় ধরনের তেল বিপর্যয়ের
খবর পাওয়া গেছে।
আটলান্টিকে যুদ্ধজাহাজ
ও সাবমেরিনের রেষারেষি
পরিস্থিতি আরও জটিল
হয়েছে যখন মার্কিন কোস্ট গার্ড ভেনেজুয়েলা থেকে আসা তেলের ট্যাংকার আটকাতে শুরু করেছে।
এর মধ্যে এমভি বেলা নামের রাশিয়ান পতাকাবাহী একটি ট্যাংকার আটলান্টিক মহাসাগরে আটকিয়েছে
মার্কিন কোস্ট গার্ড, তা এক্সে জানিয়েছে মার্কিন সেনাবাহীনার ইউরোপীয় কামান্ড। যদিও
ট্যাংকারটি মার্কিন অবরোধ এড়াতে পালানোর চেষ্টা করলে রাশিয়া সেটির সাহায্যে একটি সাবমেরিন
ও যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিল। ট্যাংকারটি রাশিয়ার পতাকা লাগিয়ে এখন আর্কটিক অঞ্চলের দিকে
পালিয়ে যেতে চেয়েছিল, যাতে মার্কিন বাহিনী বরফ শীতল আবহাওয়ার কারণে তাদের পিছু নিতে
না পারে।
মাদুরো আটক, কিন্তু
ক্ষমতা কার হাতে?
ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের
শাসক নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন স্পেশাল
ফোর্স অভিযানে আটক করে। আটকের পরপরই তাদের উড়িয়ে নেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনের
একটি আদালতে। সোমবার সেখানে শুনানির সময় মাদুরোর পায়ে শিকল পরানো ছিল এবং তার পরনে
ছিল কয়েদিদের পরিচিত কমলা ও বেইজ রঙের পোশাক।
ভেনেজুয়েলার এই ৬৩
বছর বয়সী ক্ষমতাচ্যুত নেতা বিচারকের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, “আমি এখনো
আমার দেশের প্রেসিডেন্ট এবং আমাকে অন্যায়ভাবে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটকে রাখা হয়েছে।”
তার বিরুদ্ধে মাদক পাচার, সন্ত্রাসবাদ ও দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। আগামী
১৭ মার্চ তার পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক হয়েছে।
তবে মাদুরো আটক হলেও
তার সোশ্যালিস্ট পার্টির সহযোগীরা এখনো ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতা ধরে রেখেছে। অন্তর্বর্তীকালীন
প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এখন উভয় সংকটে। একদিকে তিনি মাদুরোকে ‘অপহরণের’ নিন্দা
করছেন, আবার ট্রাম্পের সরাসরি হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা
করছেন।
ট্রাম্পের কৌশল: গণতন্ত্র নয়, অগ্রাধিকার এখন তেল
সবাই ধারণা করেছিল মাদুরো চলে যাওয়ার পর হয়তো ভেনেজুয়েলায় দ্রুত নির্বাচন হবে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বর্তমান পরিকল্পনা ভিন্ন। তিনি এই মুহূর্তে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা বিরোধী দলের নেতা মারিয়া করিনা মাচাদোকে ক্ষমতায় বসানোর চেয়ে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ উদ্ধারের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে, ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তারা এখনই মাদুরোর সব সহযোগীকে সরিয়ে দিচ্ছে না। বরং অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে সমঝোতা করে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে দেশটির তেল উৎপাদন আবার শুরু করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্পের সাফ কথা, ভেনেজুয়েলা থেকে আসা তেলের মুনাফা দিয়েই এই অভিযানের সমস্ত খরচ তুলে নেওয়া হবে।
ভেনেজুয়েলা এখন বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে (৩০০ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি)। কিন্তু সেই তেল এখন আশীর্বাদ না হয়ে আন্তর্জাতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।