বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:২৬ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বিনিয়োগবান্ধব কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রস্তাব রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের (সিএমজেএফ) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এ দাবি জানান সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. সাজ্জাদুল হক। এ সময় সংগঠনটির সভাপতি কাজী মো. নজরুলসহ অন্যান্য নেতা উপস্থিত ছিলেন।
সাজ্জাদুল হক বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালের ৬ ডিসেম্বর পুঁজিবাজারকে আইসিইউতে ঢুকিয়ে দিয়েছে, যা ওই সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) অব্যাহত ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই আইসিইউতে প্রবেশ করে সংস্কারের নামে পুঁজিবাজারের বিনিযোগকারীদের অর্থনৈতিক গণহত্যার শিকারে পরিণত করেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রতিফলন বর্তমান ভয়াবহ দুর্বিষহ বাজার পরিস্থিতি।
তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের সময় ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৬ হাজার ১৫ পয়েন্ট, যা ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর নেমে এসেছে ৪ হাজার ৮৫০ পয়েন্টে। অর্থাৎ বিগত ১৭ মাসে সূচকের পতন হয়েছে ১ হাজার ১৫০ পয়েন্টের ওপরে। দৈনিক লেনদেন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে ৩৫০ কোটিতে নেমেছে। এ ছাড়া মার্কেট পিই ৯ পয়েন্টের নিচে, যা বিশ্বের কোনো পুঁজিবাজারে নেই। পৃথিবীতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে পুঁজিবাজার ১২ বছর আগে যেখানে ছিল, তার চেয়েও খারাপ অবস্থায় গেছে।
সাজ্জাদুল হক আরও বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকগুলো যদি তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতেন, তাহলে এতটা ভয়াবহ দিন দেখতে হতো না। পুঁজিবাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি না করে ১০ হাজার কোটি টাকার ফান্ড কেন, ১০ লাখ কোটি টাকা দিলেও কোনো ফল পাওয়া যাবে না। উল্টো সরকার আরও বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে। বিগত ১৭ মাসে বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর পুঁজিবাজারে উৎসাহমূলক কোনো একটা কাজ দেখাতে পারেনি, নিরুৎসাহিতমূলক কর্মকাণ্ড প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে করেছে। এর জ্বলন্ত প্রমাণ হলোÑ আন্তর্জাতিক মার্জার রুলস অনুসরণ না করে পাঁচটি ব্যাংক মার্জার করে ব্যাংকের আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডার বিনিয়োগকারীদের দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিগত ১৭ মাসে একটাও গ্রহণযোগ্য আকর্ষণীয় কোম্পানিকে আইপিওতে আনার সক্ষমতা দেখাতে পারেনি।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে কিছু প্রস্তাব ও সুপারিশ ধরেছে পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ। এর মধ্যে রয়েছেÑ ১. আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে বিনিয়োগকারী সংগঠনের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা করে বিনিয়োগকারীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে সময়োপযোগী যুগান্তকারী প্রস্তাবনা থাকতে হবে। দলগুলোর ইশতেহারে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে, পুঁজিবাজারে এবং ইনস্যুরেন্স সেক্টরে কী কী সংস্কার করবে, কী কী বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ রাখবে, তা পরিষ্কার করতে হবে।
২. পুঁজিবাজারে দৈনিক শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্রে একই শেয়ার দিয়ে নিটিং সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। এই নিয়ম ২০০৭ সালে বাজারে ইতিবাচকভাবে প্রচলিত ছিল। এতে বাজারে প্রতিটি কোম্পানির শেয়ারের একটি শক্তিশালী ও টেকসই মূল্যস্তর বজায় থাকবে। এই নিয়মটি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকার হাউসের অনৈতিক কমিশনপ্রাপ্তির লোভের কারণে পুঁজিবাজারে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
৩. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা, ক্ষমতা ও প্রটোকল সমান করতে হবে। এতে দেশের পুরো আর্থিক খাত এবং পুঁজিবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত মুরব্বিয়ানা দূর হয়ে সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে।
৪. পাঁচটি ব্যাংক মার্জারের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের ফেসভ্যালু ১০ টাকা দিতে হবে অথবা নতুন সম্মিলিত ব্যাংকের সমপরিমাণ শেয়ার প্রত্যেক শেয়ারহোল্ডারকে দিতে হবে। বর্তমান সরকারের দুই মাস মেয়াদে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন-সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নতুন নির্বাচিত সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর মার্জার ও অবসায়ন-সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। আগামী দুই মাস বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুর কেবল তার রুটিনওয়ার্ক করতে পারবেন।
৫. আগামী ৩ মাসের মধ্যে ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’ পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত করতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সেতু বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর বিন্দুমাত্র শৈথিল্য বরদাশত করা হবে না। এ ছাড়া নেসলে বাংলাদেশ, ইউনিলিভারসহ অন্যান্য মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, মেটলাইফ, অপসোনিন, এসকেএফ, নাসির গ্লাস, পিএইচপি গ্লাস ফ্যাক্টরি, সরকারি লাভজনক স্বায়ত্তশাসিত কোম্পানি, দেশের অন্যান্য লাভজনক কোম্পানি বাজারে অবিলম্বে তালিকাভুক্ত করলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বাইরে থাকতে পারে না।