প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:৩৩ পিএম
দেশের নিম্নআয়ের তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ১৫ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি। এই টাকায় জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী ও নারীদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট’ (রেইজ) প্রকল্পের আওতায় এই অতিরিক্ত অর্থায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সারা দেশে আরও প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার তরুণের কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। এর আগে প্রকল্পটির আওতায় ২ লাখ ৩৩ হাজার মানুষ সুবিধা পেয়েছেন।
প্রকল্পের আওতায় অংশগ্রহণকারীরা দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা পাবেনÑ যা তাদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের বাধা দূর করতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে উন্নত শিশু যত্ন কেন্দ্র (চাইল্ড কেয়ার) এবং জলবায়ু সহনশীল জীবিকা নির্বাহের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর গেল মার্টিন বলেন, ‘একটি ভালো চাকরি একটি জীবন, একটি পরিবার এবং একটি সমাজকে বদলে দিতে পারে। প্রতি বছর বাংলাদেশে অনেক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও কাঙ্ক্ষিত কাজ পাচ্ছে না। এই অতিরিক্ত অর্থায়ন নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর তরুণদের, বিশেষ করে নারীদের বাজার-চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা এবং সম্পদ অর্জনে সহায়তা করবে।’
প্রকল্পের টিম লিডার অনিকা রহমান বলেন, ‘রেইজ প্রকল্প ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারে। নতুন এই অর্থায়নের মাধ্যমে আমরা মানসম্মত শিশু যত্নের মতো উদ্ভাবনী সমাধান যুক্ত করছি, যা নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে সাহায্য করবে।’
বিশ্বব্যাংক জানায়, প্রকল্পটি শহরের বাইরে গ্রামীণ পর্যায়েও বিস্তৃত করা হবে। বিশেষ করে বাড়িতে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী শিশু যত্ন সেবা চালুর লক্ষ্যে নারীদের প্রশিক্ষণ ও স্টার্ট-আপ অনুদান দেওয়া হবে। এটি একদিকে যেমন নারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও বিকাশে ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে চাকরিপ্রার্থীদের সংযোগ ঘটাতে জব ফেয়ার বা চাকরি মেলার আয়োজনও করা হবে। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের ফলাফল বেশ ইতিবাচক। প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষানবিশ কোর্স শেষ করার তিন মাসের মধ্যে কর্মসংস্থান পেয়েছেন। এ পর্যন্ত ৫০ হাজারেরও বেশি করোনা-ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ২ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি বিদেশফেরত অভিবাসীকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ-২০২২ অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিবিএস পাঁচ বছর পরপর এই জরিপ করে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা বেড়ে হয়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থান ২০ লাখ কমে গেছে। ৩০ লাখের বেশি কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারের বাইরে।
পিপিআরসির প্রতিবেদনে দেখা যায়, শহরের একটি পরিবারের গড়ে মাসিক আয় ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা। খরচ হয় ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। জাতীয়ভাবে একটি পরিবারের মাসে গড় আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা। খরচ হয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। সঞ্চয় নেই বললেই চলে।
বিবিএসের জরিপে ২০২২ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রাক্কলন হলো, গত অর্থবছরে বাংলাদেশে অতিদারিদ্র্য মানুষের হার বেড়ে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে দৈনিক তিন ডলার আয়ের নিচের মানুষকে অতিদারিদ্র্য হিসেবে গণ্য করে।
বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে এক বছরের ব্যবধানে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে এক লাখ ৬০ হাজার। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ২০ হাজারে, যা ২০২৩ সালে ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার। মোট বেকারের মধ্যে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী। এ ছাড়া দেশে কর্মে নিয়োজিত জনগোষ্ঠী কমেছে।
প্রতিবেদন বলছে, বেকারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। শিক্ষায় এর একটু নিচের স্তর উচ্চমাধ্যমিক শেষ করা বেকারের হার ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। মোট বেকারের মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়ালেখা শেষ করাদের হার ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আর কোনো রকম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেইÑ বেকারত্বে এদের হার সবচেয়ে কম, মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ।