প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:১২ পিএম
আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:২২ পিএম
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। গ্রাফিক্স প্রবা
দেশের বিদ্যমান প্রেক্ষাপট বিশেষ করে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও আইএমএফ কর্মসূচির শর্ত—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’ নিয়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। গভর্নর যেখানে বাস্তব নীতিনির্ধারণের সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন, অর্থনীতিবিদেরা সেখানে বলছেন কাঠামোগত সংস্কারের কথা।
বৃহস্পতিবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাত সংস্কার: চ্যালেঞ্জ উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আহসান এইচ মনসুর আবারো বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতার জরুরতের কথা তুলেছেন।
গভর্নর বলেন, ‘আমরা একটি খারাপ অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে যাচ্ছি। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো হয়েছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এসেছে। ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা ডলার পরিস্থিতি নিয়ে এখন কোনো উদ্বেগ নেই।’
তবে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সমস্যার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘অনেক ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি রয়েছে এবং খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
‘আমার ধারণা ছিল, খেলাপি ঋণ ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ হবে, কিন্তু বাস্তবে তা প্রায় ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আমরা কোনো তথ্য লুকাবো না। যা সত্য, সেটাই প্রকাশ করা হবে।’
ব্যাংক সংস্কারের অংশ হিসেবে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ সম্পর্কেও জানান গভর্নর। আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘একীভূত ব্যাংকগুলোর আমানত নিরাপদ থাকবে। আমানত বিমার আওতায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়া হবে। নতুন ব্যাংকে ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হলে সেখানে লোকসানের কোনো সম্ভাবনা নেই।’
২০ কোটি টাকার বেশি সব ঋণ নতুন করে যাচাই করা হবে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ‘এসব ঋণের জামানত ঠিক আছে কি না, তা দেখা হবে। না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহি করতে হবে।’
বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে রাজনৈতিক চক্র ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব ব্যাংক খাতে প্রবল, সেখানে শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়া খেলাপি ঋণ, ব্যাংক লুট ও অনিয়ম ঠেকানো সম্ভব নয়—এ কথা অনেক দিন ধরে বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।
একই কথা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক সময়ের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণ পর্যায়ের কর্মকর্তা আহসান এইচ মনসুরেও।
ইআরএফের সেমিনারে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা দরকার। ভালো নেতা দরকার। এ জন্য সরকারের কাছে আইন প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সরকার এই আইন পাস করে দিলে সব করা যাবে।’
একই অনুষ্ঠানে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় বাজেটের সমান উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘একসময় ব্যাংকিং খাত উদ্যোক্তা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নীতিগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দেওয়ার কারণে খাতটি ধ্বংসের মুখে পড়ে।’
‘আগে প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হতো বলে খেলাপি ঋণের হার কম দেখানো হতো। এখন নিয়ম অনুযায়ী হিসাব করায় এই হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।’
সংকট উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্টসহ বিভিন্ন পদক্ষেপকে ইতিবাচক উল্লেখ করেন ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, ‘এসব সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।’
তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘ব্যাংকিং খাত ঘুরে দাঁড়াতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের কারণেই খাতটি আজ এই অবস্থায় পৌঁছেছে।’
সামনে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ‘ব্যাংকিং খাত নিয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার’ থাকা জরুরি বলে উল্লেখ করেন ফাহমিদা খাতুন।
বাংলাদেশ ব্যাংককে কেবল `নীতিগত স্বাধীনতা' নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি স্বাধীনতা দিতে হবে, যাতে গভর্নর বা নীতিনির্ধারকেরা রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং প্রয়োজনে শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারেন—সরাসরি এমন কথাই বলে আসছেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে।