আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ২১:১২ পিএম
খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের ক্যানসারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্যে ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই খেলাপি। যার মধ্যে ১২টি ব্যাংকের খেলাপির সংখ্যা ৭০ শতাংশের ওপরে। এ ছাড়া ১৭ ব্যাংকের খেলাপি ব্যাংক খাতের মোট খেলাপির অর্ধেক। যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার নামে লুটপাট করেছে। সে সময় এসব ঋণ খেলাপি হওয়ার যোগ্য হলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় তা শ্রেণিকরণ করা হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রবণতা বন্ধ হওয়ায় এখন ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫ থেকে ১০ শতাংশ, ১৩ ব্যাংকের ১০ থেকে ২০ শতাংশ এবং ছয় ব্যাংকের ২০ থেকে ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া ১২ ব্যাংকের খেলাপি ৭০ শতাংশ প্রায় শতভাগ খেলাপি।
সেপ্টেম্বর মাসের সবশেষ তথ্যে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আট হাজার ৮১১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ; জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ১৮ শতাংশ; পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পাঁচ হাজার ২২৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৪ দশমিক ১৭ শতাংশ; আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬৩১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ; এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ০৪ শতাংশ; ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩২ হাজার ৪০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ; বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭১ দশমিক ১১ শতাংশ এবং বিদেশি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের (এনবিপি) খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশিÑ ৯৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ বা এক হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫৬ থেকে ৯৬ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের হার ইউনিয়ন ব্যাংকের। এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৭ হাজার ১১৩ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের, যেখানে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ২০ শতাংশ। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭০ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি চারটি ছিল চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার ও বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তারা দুজনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের রূপালী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট, জনতা ও বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫১ থেকে ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। সেপ্টেম্বর শেষে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫১ দশমিক ১৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক হাজার ৯৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
ব্যাংকাররা জানান, ওই সময়ে এসব ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে মালিকপক্ষ ঋণের নামে বিপুল অঙ্কের টাকা তুলে নেয়। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর লুকিয়ে রাখা খেলাপিযোগ্য ঋণগুলো খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ পায়। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার এসব ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘খেলাপি ঋণের এই লাগামহীন বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। ব্যাংক খাতে এখন প্রায় ৩৬ শতাংশ ঋণ নন-পারফর্মিং হিসেবে শ্রেণিভুক্ত। এর যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংককে বেশি প্রভিশন রাখতে হয়, ফলে তাদের আয় কমে যায় এবং মূলধনভিত্তি দুর্বল হয়। দেশকে অবশ্যই এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে হবে। ঋণখেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঋণ শ্রেণিকরণ করায় খেলাপির হার কিছুটা বেশি দেখাচ্ছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬০ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ছয় হাজার ২৭৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। এক বছর আগে একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৫৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা, অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি। দেশের মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে ১০টি ব্যাংকের চার লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশ।