প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:৩১ পিএম
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে চুরি, অপচয় ও অনিয়ম কমানোর লক্ষ্যে কার্যক্রম ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ লক্ষ্যে নেওয়া একটি প্রকল্পেই প্রস্তাবিত ব্যয়ের ধরন ও অঙ্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পরামর্শক খাতে ৬৮ কোটি টাকা, প্রশিক্ষণে ৮ কোটি টাকা এবং সেমিনার বা কনফারেন্সে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাবকে ব্যয়ের নয়ছয় ছক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বব্যাংকের ঋণের অর্থে এমন ব্যয় কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
‘সোশ্যাল প্রটেকশন ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন (এসপিডিটিসি)’ শীর্ষক প্রকল্পটি নিয়ে সম্প্রতি বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠেয় ওই সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে প্রস্তাবিত ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন তোলা হয়।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৭২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে ৯৭ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে থাকছে অর্থ বিভাগ। তবে এখনো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্পটি বরাদ্দ পায়নি। গত ২৩ জুলাই অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রোগ্রামিং কমিটির সভায় এটি অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে পরামর্শক খাতে প্রস্তাবিত ৬৮ কোটি টাকা নিয়ে। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্প প্রস্তাবে এই পরামর্শকরা দেশি না বিদেশি, কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন কিংবা কী কাজের জন্য এত বড় অঙ্কের পরামর্শক ব্যয় দরকারÑ সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্পে পরামর্শকের নামে অহেতুক ব্যয়ের নজির আগেও দেখা গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই বৈদেশিক ঋণ প্রকল্পে প্রয়োজন না থাকলেও পরামর্শক ব্যয় চাপিয়ে দেওয়া হয়। এটি এক ধরনের বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে। তার ভাষায়, অনেক সময় অযোগ্য পরামর্শক এসে অফিস ভাড়া করে বসে বসে টাকা নিয়ে চলে যায়। ভালো পরামর্শক থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় পরামর্শকের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হয়। তিনি বৈদেশিক ঋণের প্রকল্পে এই অপ্রয়োজনীয় পরামর্শকের বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা বলেছেন।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র আরও জানায়, প্রকল্পে গাড়িভাড়া খাতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে, তা দিয়ে সরাসরি গাড়ি কেনা সম্ভব কি না, সেটিও যাচাই করা হবে। একইভাবে সেমিনার বা কনফারেন্স খাতে বৈদেশিক ঋণের অর্থসহ ৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হবে। প্রশিক্ষণ খাতে প্রস্তাবিত ৮ কোটি টাকা কীভাবে ব্যয় হবে, কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং এই প্রশিক্ষণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণÑ এসব বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। পাশাপাশি প্রকল্প শেষে ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে চলবে, সে সম্পর্কিত এক্সিট প্ল্যান নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশীদ বলেন, এত বড় অঙ্কের অর্থ পরামর্শক খাতে কেন প্রয়োজন, তার ব্যাখ্যা অবশ্যই চাওয়া উচিত। তার মতে, বৈদেশিক ঋণ হলেও এসব অর্থ অহেতুক ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করে। অনেক সময় বাধ্য হয়েই এসব পরামর্শক ব্যয় মেনে নিতে হয়, ফলে খরচ নয়ছয়ের ঝুঁকি থেকে যায়।
তিনি বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঋণ আলোচনার সময়ই এসব বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। কারণ প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে আসার আগেই ইআরডি অনেক সময় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে ফেলে। এরপরও অর্থ বিভাগ, ইআরডি ও পরিকল্পনা কমিশনÑ সব পক্ষেরই বিষয়গুলো গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বিকাশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বাস্তবায়ন এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন, সুবিধাভোগী নির্বাচন ও সেবা প্রদানে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানো এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি সিস্টেমভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি গবেষণা পরিচালনা, সামাজিক সুরক্ষা তথ্য বিশ্লেষণ, সরকারি কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড, স্বয়ংক্রিয় যাচাইকরণ ব্যবস্থা, দুর্নীতি কমাতে অভিযোগ ট্র্যাকিং সিস্টেম এবং ডেটাভিত্তিক নীতিনির্ধারণের জন্য বিশ্লেষণ ও ভিজুয়ালাইজেশন টুল ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে একক রেজিস্ট্রি, পেমেন্ট প্লাটফর্ম ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের তথ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরকারি কর্মীদের এমআইএস পরিচালনায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তবে প্রকল্পের উদ্দেশ্য যতই ইতিবাচক হোক না কেন, প্রস্তাবিত ব্যয়ের ধরন ও অঙ্ক সামাজিক নিরাপত্তার নামে নতুন করে অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি করবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। পরিকল্পনা কমিশনের আসন্ন বৈঠকে এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা।