প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:২৭ পিএম
চিকিৎসা ব্যয়ে প্রতিবছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় আস্থার অভাব, সঠিক রোগ নির্ণয় না হওয়া ও অনুন্নত সেবা ব্যবস্থাপনার কারণে এমনটি হচ্ছে। এর বাইরে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির মাত্র ১ শতাংশেরও কম বরাদ্দ অন্যতম কারণ। তাই স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি উন্নত চিকিৎসার জন্যে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ আরও বাড়ানো দরকার। চিকিৎসায় আরও উন্নত যন্ত্র ও উন্নতি প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটাতে হবে।
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থা বৃদ্ধি; মান নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত কাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধে এসব কথা বলা হয়েছে।
চেম্বার সভাপতি তাসকীন আহমেদের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক একে আজাদ খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী।
স্বাগত বক্তব্যে সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশে মানসম্মত ও রোগীবান্ধব সেবা নিশ্চিতে এখনও কাঠামোগত ঘাটতি রয়ে গেছে। এ ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবা মানের অসমতা, প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের ঘাটতি, অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ফার্মেসির সম্প্রসারণ, ভুল ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট, ভুয়া ওষুধ ও তদারকি দুর্বলতা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং সর্বোপরি বিদ্যমান আইনে বাস্তবায়নে উদাসীনতা আমাদের জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং আস্থাকে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবহার না থাকার কারণে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৪% ব্যক্তিকে নিজস্ব ব্যয়ে বহন করতে হয়। যে কারণে নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে বড় ঝুঁকিতে পড়েন।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি একে আজাদ খান বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় বেশ অর্জন রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা যায়নি। দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত দেশগুলোর মতো নয়, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে আমরা পিছিয়ে রয়েছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষে ইউনিভার্সেল স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, তবে আমাদেরকে প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের ওপর জোর দিতে হবে। এ খাতের ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নের পাশাপাশি বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল হেলথ কেয়ার কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যাায় স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পথে বেশকিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয়ে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশেরও কম। রোগীরা ৭৩ শতাংশ চিকিৎসা খরচ নিজে বহন করেন। মাত্র ২.৫ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্য বীমার আওতায় রয়েছেন। প্রায় ৮০ শতাংশ হাসপাতালেই উন্নত ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি নেই। বেসরকারি খাত ৬০ শতাংশ সেবা দিলেও, তাতে উচ্চমূল্য ও গুণগত মানের পার্থক্য রয়েছে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, বিদেশে চিকিৎসায় প্রতিবছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বাইরে চলে যাচ্ছে। চিকিৎসা নিতে সবচেয়ে বেশি রোগী ভারতে যান। ভারতের চিকিৎসা ভিসার প্রায় ৫২ শতাংশ বাংলাদেশির। ২০২৪ সালে প্রায় ৪ লাখ ৮২ হাজার বাংলাদেশি রোগী ভারতে চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের পরে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার অবস্থান। দেশের চিকিৎসায় বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে। রোগ নির্ণয় ঠিক হচ্ছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থাকে। হঠাৎ বিল বেড়ে যায় ও লুকানো খরচের ভয় থাকে। নকল ওষুধ ও নিম্নমানের সামগ্রীর আশঙ্কা।
এতে বলা হয়, সেবার মানে ঘাটতি ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা কম। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার অভাব রয়েছে। উন্নত চিকিৎসা শুধু ১৫টি কেন্দ্রে পাওয়া যায়, অনেক রোগী বিদেশে যেতে বাধ্য হন। এর বাইরে চিকিৎসার খরচ পূর্বে নির্ধারিত নেই। জটিল রোগের পরবর্তী সেবা পর্যাপ্ত নয়। একক স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থা নেই। স্বাস্থ্য প্রোগ্রামের তদারকি ও ক্রয় ব্যবস্থায় দুর্বলতা। একই সঙ্গে রোগী ও পরিবারের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা কম। এসব কারণে রোগীরা দেশের বাইরে যাচ্ছেন।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, দেশের ৩৬টি স্পেশালাইজড হাসপাতালের মধ্যে ঢাকায় ১৯টির অবস্থান ও ঢাকার বাইরে ১৭টি। ঢাকা বিভাগে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা ১ হাজার ৮১০টি। আর ৭ বিভাগে রয়েছে ৩ হাজার ৬৫১টি।
এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম, মাথাপিছু খরচ মাত্র ১ হাজার ৭০ টাকা। দেশের ৪৯ শতাংশ মানুষ এখনও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পায় না। মানুষের জন্য সরকারের উপযোগী স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম এখনও যথেষ্ট নয়।
প্রবন্ধে জানানো হয়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বাজার ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী ২০৩০-৩৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বাজার প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার হবে অর্থাৎ এই খাতের আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। দেশে একই সময়ে মেডিকেল ডিভাইসের বাজারও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫ সালে এটি ৮২০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা ২০২০ সালে ছিল ৪৪২ মিলিয়ন ডলার। বিশেষ করে আমদানির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই খাতে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাই এ খাতে সরকারি ও বেসরকারি আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় গ্রিন লাইফ সেন্টারের চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক ডা. দীপক কুমার মিত্র, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটর পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাফিউন নাহিন শিমুল, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. মো. জাকির হোসেন, আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ-এর ম্যানেজার (পলিসি অ্যাডভোকেসি) ডা. মুশারাত জাহান, ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর হেলথ সিস্টেমস স্পেশালিস্ট ডা. ফিদা মেহরান এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (রোগী নিরাপত্তা ও রক্ত নিরাপত্তা) ডা. মুরাদ সুলতান অংশগ্রহণ করেন।