× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিআইডিএসের প্রতিবেদন

জলবায়ুর প্রভাবে কমবে ধানের উৎপাদন

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:১৪ পিএম

জলবায়ুর প্রভাবে কমবে ধানের উৎপাদন

দেশের কৃষি খাত এক গভীর রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, তবে এ রূপান্তর আশাবাদের নয় বরং উদ্বেগের। সাম্প্রতিক গবেষণা ও উপাত্ত বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রম উৎপাদনশীলতার পতন এবং জলবায়ু, সংবেদনশীল কৃষি, পরিবেশ সব মিলিয়ে ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘পার্সপেক্টিভ অন দ‍্য এগ্রিফুড সিস্টেম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বিআইডিএসের মহাপরিচালক প্রফেসর একেএম এনামুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা বিভাগের সচিব শাকিল আখতার।

উপাত্ত অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সাম্প্রতিক দুই দশকে এ বৃদ্ধির হার আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। কৃষি গবেষকরা বলছেন, ধান একটি অত্যন্ত তাপসংবেদনশীল ফসল। উচ্চ তাপমাত্রা ধানের গাছের পরাগায়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত করে, শিষে দানাভর্তি কম হয় এবং হিট স্ট্রেসের কারণে ধানের গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, বোরো মৌসুমে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে গভীর। উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, উষ্ণ পরিবেশ কৃষিশ্রমিকের কাজ করার সময় কমিয়ে দেয় এবং প্রতি ঘণ্টার শ্রম-উৎপাদনশীলতা ১১ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে, ফলন কমে এবং ধানচাষের আর্থিক লাভ দ্রুত কমে যায়। জলবায়ুজনিত উৎপাদনশীলতা হ্রাস জাতীয় অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে, এ ক্ষতির পরিমাণ মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

শুধু তাপমাত্রা নয়, বৃষ্টিপাতের ধরনেও বড় পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, মোট বৃষ্টিপাত কমছে এবং বৃষ্টিপাতের ভ্যারিয়েবিলিটি বা অনিয়ম বাড়ছে। আউশ মৌসুমে বৃষ্টি কম হলে অঙ্কুরোদগম ব্যাহত হয়, আবার অতিরিক্ত বৃষ্টিতে জমি তলিয়ে যায়। আমন ধান এখনও বর্ষার ওপর নির্ভরশীল; বর্ষা দেরিতে শুরু হলে বপন ও রোপণ পিছিয়ে যায়, আর হঠাৎ ভারী বর্ষণে ক্ষেত ডুবে গিয়ে ফলন কমে। বোরো মৌসুমের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে সেচ নির্ভরতার কারণে, কারণ বর্ষা সংকুচিত হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ছে কিন্তু পুনঃভরাট হচ্ছে কম। কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলসহ বহু এলাকায় বোরো মৌসুম ব্যাহত হবে।

উপস্থাপনায় মডেলিং বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৩০ সালে ধানের ফলন প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমবে। ২০৪০ সালে এ পতন বেড়ে দাঁড়াবে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে, আর ২০৫০ সালের মধ্যে ধানের ফলন ৪ শতাংশের বেশি কমার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পতন শুধু পরিসংখ্যান নয়; বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর এটি সরাসরি চাপ সৃষ্টি করবে। ধান দেশের প্রধান খাদ্যশস্য হওয়ায় তুলনামূলক কম হ্রাসও বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক আঘাত সৃষ্টি করতে পারে। মডেলিংয়ে দেখা গেছে, পাটের মতো নগদ ফসলে উৎপাদন হ্রাস অপেক্ষাকৃত কম হবে, কিন্তু ধান, গম, ডাল, তেলবীজ ও সবজিতে উৎপাদন হ্রাস তীব্র আকার ধারণ করবে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, বাংলাদেশের কৃষি মোট উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদনশীলতা বা টোটাল ফ্যাক্টর প্রোডাক্টিভিটি (টিএফপি) ২০১১ সালের পর থেকে স্থবির হয়ে পড়ে এবং ২০১৮-২০২১ সময়ে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। এতে বোঝা যায়, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে যে পরিমাণ সার, সেচ, বীজ, শ্রম ও যান্ত্রিকীকরণ ব্যবহার হচ্ছে, সেই তুলনায় উৎপাদন বাড়ছে কম। ইনপুট ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, পণ্যের দাম সেই হারে বাড়ছে না, ফলে কৃষকের লাভ কমছে। ধানের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও প্রকট, কারণ এর উৎপাদন খরচ বোরো মৌসুমে সবচেয়ে বেশি।

অন্যদিকে, প্রযুক্তি গ্রহণে কৃষকের ধীরগতি, জমির খণ্ডিত মালিকানা, এক ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বাজার ব্যবস্থার আধিপত্য- সব মিলিয়ে ধানের উৎপাদনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। কৃষিবাজারে মিলার ও ট্রেডারদের কর্তৃত্বের কারণে কৃষক অনেক সময় ন্যায্য দাম পায় না। ফলে উন্নত বীজ, যন্ত্র বা প্রযুক্তি ব্যবহার করার মতো আর্থিক সক্ষমতা থাকে না। কৃষি উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, ধানচাষের লাভজনকতা ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ক্রমাগত কমেছে; ইনপুট খরচ বেড়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ হারে, কিন্তু ধানের দাম বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৩১ শতাংশ হারে।

জলবায়ুর এ বহুমাত্রিক অভিঘাত মোকাবিলায় কৃষিবিজ্ঞানীরা কয়েকটি জরুরি করণীয় তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, উচ্চফলনশীল ও তাপসহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন ও দ্রুত সম্প্রসারণ এখন সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে, ভূগর্ভস্থ পানির অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলন কমানো। ফসল বৈচিত্র্য বাড়ানো, কৃষককে প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, কৃষিযন্ত্রের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য বাজারকাঠামো সংস্কারও জরুরি হয়ে পড়েছে।

উপাত্তের সামগ্রিক চিত্র বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন শুধু ভবিষ্যতের পূর্বাভাস নয়, বরং ইতোমধ্যেই মাঠপর্যায়ে ধরা দিতে শুরু করেছে। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও পরিবেশগত চাপের সম্মিলিত প্রভাব আগামী দুই-তিন দশকের মধ্যে ধান উৎপাদনে স্থায়ী সংকট তৈরি করতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতি তথা সবকিছুতেই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা