জিইডির বিশ্লেষণ
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ ২১:১৭ পিএম
বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে- এমন চিত্রই উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সর্বশেষ বিশ্লেষণে।
সম্প্রতি ইকোনমিক আউটলুক শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সংকট ও আস্থাহীনতার মধ্যেও নতুন ব্যবসা শুরু বা বিদ্যমান উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোক্তারা এগোতে চাইছেন, তবে তারা এখন মূলত নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। জিইডির ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়িক পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল হবে এবং আর্থিক খাত ও জ্বালানি বাজারে সংস্কার কতটা ধারাবাহিক থাকবেÑ উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্ত এখন তার ওপরই নির্ভর করছে।
জিইডি বলছে, আসন্ন নির্বাচন যদি স্পষ্ট রাজনৈতিক গতিপথ নিশ্চিত করে এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে ব্যবসা ও আর্থিক খাতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারগুলো ধরে রাখে, তাহলে দেশের প্রবৃদ্ধির হার পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা শক্তিশালী হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা, স্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও কমে যাওয়া ব্যবসায়িক আস্থা বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ ও স্থানীয় চাহিদাকে সীমিত করে রেখেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা শেষ হলে এসব বাধা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনীতি নিয়ে সতর্ক আশাবাদের কথা তুলে ধরেছে জিইডি। তাদের ব্যাখ্যায় সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ভোগ ও বিনিয়োগের ওপর স্থায়ী চাপে পতন ঘটাতে পারে মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা। তবে একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত হয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। রিজার্ভ বৃদ্ধি ও প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহকে এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের নভেম্বরের ২৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ ২০২৫ সালের অক্টোবরে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে। আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমার প্রবণতা এ উন্নত অবস্থানের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে রপ্তানি আয়ে ওঠানামা বজায় ছিল। চলতি বছরের এপ্রিল ও জুনে রপ্তানিতে পতন দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে বিশেষত অক্টোবরে সূচকে উন্নতি হয়েছে। পোশাক রপ্তানির ধীরগতি বছরের প্রথম ভাগে প্রভাব ফেললেও পরে পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, খাদ্যদ্রব্যের দাম স্থিতিশীল হওয়ায় এবং সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এখন নিম্নমুখী। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালের অক্টোবরে তা ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এসেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি হারে কমেছে ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে। জিইডির হিসাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখে চাল, যার অবদান অক্টোবরে ছিল ৪৭ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। মাছ ও মাংসের প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। তবে মৌসুমি সরবরাহ ভালো থাকায় সবজির দাম কম ছিল, যা সামগ্রিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
জিইডির পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান, বিনিয়োগ ও বাজারের গতি ফিরিয়ে আনতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা। নির্বাচনোত্তর পরিবেশ এবং সরকারের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার চলমান থাকলে উদ্যোক্তারা আবারও বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন বলে সংস্থাটি মনে করছে।