প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ২২:০৬ পিএম
আগামী সপ্তাহে একীভূত নতুন ব্যাংকের যাত্রা শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘আমাদের অচল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে কিছু করার দরকার ছিল। ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ প্রয়োগ করে পাঁচ ব্যাংক নিয়ে আমরা একটি নতুন ব্যাংক করতে যাচ্ছি। আশা করি, আগামী সপ্তাহেই এ ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়ে যাবে।’
শনিবার (২৯ নভেম্বর) বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সামষ্টিক অর্থনীতি’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তিনি।
গভর্নর বলেন, ‘একীভূত ব্যাংকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকবে। এর চেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক আর হবে না। সরকারের সাহায্যেই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নিয়ে একটি সবল ব্যাংক তৈরি করব আমরা।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক সমস্যা আছে, এগুলোর গভীরতাও অনেক। এরপরও আমরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র অর্থনীতির উন্নয়ন করতে পেরেছি। বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট সারপ্লাসসহ বৈশ্বিক লেনদেনে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।’
গভর্নর বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার যখন ৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের কথা বলেছে, আমি ভেবেছিলাম এ হার তিনগুণ তথা ২৫ শতাংশ হতে পারে। এখন দেখি তা ৩৫ শতাংশ। পুরো ঋণের দুই-তৃতীয়াংশ নিয়েই ব্যাংকগুলোকে চালাতে হচ্ছে। আমাদের ধাপে ধাপে এ সমস্যা থেকে উঠে আসতে হবে।’ তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ বছর লাগবে।
আগামী ডিসেম্বর প্রান্তিকের পর থেকে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার আর বাড়বে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এনপিএল সমস্যার শেষ কোথায় তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। তবে ধারণা করছি সেপ্টেম্বর বা ডিসেম্বর প্রান্তিকেও এটি বড় হবে। ততদিনে হয়তো এটা ৩৬ থেকে ৩৭ শতাংশ হতে পারে। এরপরই তা নামা শুরু করবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এরই মধ্যে এটা অনেকটা শ্লথ হয়েছে।’
গভর্নর জানান, আমদানি এলসি (ঋণপত্র) খোলার জন্য পর্যাপ্ত ডলার মজুদ রয়েছে এবং রমজানকে সামনে রেখে পণ্য আমদানিতে কোনো ঝুঁকি নেই। গত বছরের তুলনায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি এলসি ইতোমধ্যে খোলা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির তুলনায় বর্তমান নীতি সুদহার বেশি নয় বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ শতাংশ ছিল। সে তুলনায় নীতি সুদহার ১০ শতাংশ বেশি নয়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের তুলনায় সুদহারের পার্থক্য খুব বেশি নয়।’
বিআইডিএস মহাপরিচালক এনামুল হক বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ‘চোর ধরার’ মনোভাবের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা ব্যবসায় আস্থার সংকট তৈরি করে। তার ভাষায়, অর্থনীতিতে আস্থা না থাকলে বিনিয়োগ সামনে এগোতে পারে না।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) খুব ভালো একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা ভালো না। সাধারণ মানুষ ভবন বা কিছু নির্মাণ করলে পরিবেশের ক্ষতি হয়। রাজউক কিছু করলে পরিবেশের ক্ষতি হয় না? নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও দায়বদ্ধতার জায়গায় আনতে হবে।’
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে করব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন উল্লেখ করে এ কে এনামুল হক বলেন, ‘ব্রিটিশ সরকার এদেশে জমিদারি প্রথা চালু করেছিল। জমিদাররা জনগণের কাছ থেকে টাকা তুলে সরকারকে দিত। জমিদার নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য ছিল টাকা তোলা, দেশ জাহান্নামে যাক। আর এখনকার সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে, টাকা খরচ করব কর আদায় করার জন্য। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে করব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে।’
হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ. কে. আজাদ বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক। কঠোর মুদ্রানীতিতে সুদের হার বেড়েছে, যা বিনিয়োগকে চাপের মুখে ফেলছে। বেসরকারি খাতে মাত্র ৬ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি শিল্পায়নকে প্রায় স্থবির করে দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাবে চাকরি হারিয়েছে ১৪ লাখ মানুষ। এখন তারা বেকার। প্রতিবছর অন্তত ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে চাকরিতে আসে। কিন্তু এ খাতে নতুন করে কোনো কর্ম সৃষ্টি না হওয়ায় কর্মসংস্থান হচ্ছে না, বেকারত্ব বেড়ে যাচ্ছে।’
বিএসএমএ সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-মাশুলের পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর (এআইটি) দিতে হচ্ছে। আবার টার্নওভার করও ০.১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। কোম্পানি লাভ-লোকসান যাই করুক, কর দিতে হচ্ছেÑ যা বিশ্বের কোথাও দেখা যায় না।
অন্যদিকে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘ব্যাংকগুলোকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারলে দেশ আরও এগিয়ে যেতে পারবে। সেই সঙ্গে ডিজিটালও করতে হবে। আজকের পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর ডিপোজিট গ্রোথ ১০ শতাংশের মতো হলেও রিজার্ভ কিছুটা কমে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।’