প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:৫৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বছরের এই সময়টাতে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়ে এবং দাম কমেÑ এটাই স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু চলতি বছর সেই ধারার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। সরবরাহ বাড়লেও বাজারে সবজির দাম প্রত্যাশিতভাবে কমছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
এখন বাজারে শিম কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে। অথচ একই শিম খুলনায় বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা কেজি। ২০২৪ সালে একই সবজির দাম ছিল মাত্র ৪০ থেকে ৫০ টাকা। ঢেঁড়স ও পটোলের দাম কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে, তবুও অনেক সবজির দামই গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। শীতের শুরুতেই কিছুদিন বাজারে দাম কমেছিল কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে আবার সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী।
ঢাকায় দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সবজি কেনার পরে গাড়ি ভাড়া, শ্রমিক ভাড়া, আড়ত ভাড়া দিয়ে সবকিছু যোগ করে আমাদের সীমিত লাভে বিক্রি করি। পরে খুচরা বাজারে তারা আবার লাভে বিক্রি করে। ফলে দাম বেড়ে যায়।
লালমনিরহাট আড়তে সবজি বিক্রি করতে আসা কৃষক আকবর আলী বলেন, হঠাৎ বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস ও ঠান্ডা প্রবাহের কারণে সবজি গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফলন কমে যায়। অন্যদিকে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক খরচ বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে বাজারের দামে।
বরবটি ও উচ্ছে কেজিতে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে এই দাম ছিল অন্তত ১০ টাকা কম। ঢেঁড়স ও পটোল বর্তমানে ৫০-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের বাঁধাকপি ও ফুলকপি প্রতিটি ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে কাঁচামরিচের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। গত সপ্তাহে যে মরিচ কিনতে কেজিতে ১৮০-২০০ টাকা লেগেছে, তা এখন নেমে এসেছে ১০০-১২০ টাকায়। নতুন আলু বাজারে এসেছে এবং কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। পুরনো আলুও বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২২ থেকে ২৫ টাকায়।
বাজার করতে আসা শরিফুল ইসলাম বললেন, সারা জীবন শীতে সবজির দাম কম খেয়েছি। এ বছর কি সিন্ডিকেট কাজ করছে? সরকারকে অবশ্যই এসব তদারকি করতে হবে।
খিলগাঁও বাজারের ক্রেতা খায়তুননেসা বলেন, একটু কমতে না কমতেই আবার দাম বাড়ে। নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এটা চরম কষ্টকর।
সেনামৈত্রী হকার্স মার্কেটের বিক্রেতা আলমুদ্দিন জানান, মৌসুমের শুরুতে ভারী বাতাস ও বৃষ্টির কারণে কৃষকরা সময়মতো জমিতে সবজি চাষ করতে পারেননি। এতে উৎপাদনে বিলম্ব হয়। পাশাপাশি বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাবও দামের ঊর্ধ্বগতির একটি বড় কারণ।
সবজির বাজার অস্থির থাকলেও ডিম ও মুরগির দামে রয়েছে স্বস্তি। ফার্মের ডিম ডজনপ্রতি ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যদিও মহল্লায় ১২৫/ ১৩০ টাকাও নেওয়া হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১৬০-১৭০ এবং সোনালি মুরগি ২৬০-২৯০ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। মাছ-মাংসের বাজারেও তেমন পরিবর্তন নেই।
ময়মনসিংহের বাজারগুলোতে সবজির সরবরাহ বাড়ার প্রভাব কিছুটা দেখা যাচ্ছে। গোল বেগুন ৮০, চিকন বেগুন ৬০, ঝিঙে ৬০, শসা ৫০ এবং কাঁচামরিচ ১২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া করলা ১০০, ধুন্দল ৫০, কাঁচা পেঁপে ৩০, মিষ্টিকুমড়া ৩০, গাজর ১২০, লাউ ৫০ টাকা পিস এবং কাঁচকলা ৩০ টাকা হালি দরে মিলছে।
মাছের বাজারে গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ১৫-২০ টাকা পর্যন্ত দাম কমেছে। বাজারে এখন রুই বিক্রি হচ্ছে ৩৩০-৪৩০, কালবাউশ ৩১০-৩৮০, মৃগেল ২৭০-৩২০, ট্যাংরা ৫২০-৭৯০ এবং শোল ৬০০-৬৫০ টাকায়।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্যও বলছে, মাছের দাম প্রায় স্থিতিশীল। কাতল ৩৮০-৪৫০, সিলভারকার্প ২০০-২২০, চাষের পাঙাশ ২০০-২৪০ এবং নদীর পাঙাশ ১,০০০-১,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ি ৪০০-৮০০, দেশি শিং ৬০০-৭৫০ এবং তেলাপিয়া ১৮০-২০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ২ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে আগাম সবজির আবাদ হয়েছে। ধীরে ধীরে তা আরও বাড়বে।
খাদ্যপণ্যের এই অস্থিরতার বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুস ছালাম বলেন, বাজারে সবজির সরবরাহ বেড়েছে, তাই দাম কমার কথাই। অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো যাবে না। প্রয়োজনে আমরা অভিযান পরিচালনা করব।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন জানান, কৃষকরা শীতকালীন সবজির ভালো দাম পাচ্ছেন। ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। বাজারে সরবরাহ আরও বাড়লে দাম কমে আসবে।