× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ব্যবসায়িক ঋণে মন্দা ভাব: ভোক্তায় ঝোঁক ব্যাংকগুলোর

আহমেদ ফেরদাউস খান

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:২২ পিএম

ব্যবসায়িক ঋণে মন্দা ভাব: ভোক্তায় ঝোঁক ব্যাংকগুলোর

বর্তমানে সামগ্রিক অর্থনীতির মন্থরগতির কারণে ব্যবসায়িক ঋণের চাহিদা কমছে। বিকল্প হিসেবে ভোক্তা ঋণের দিকে ঝুঁকছে পুরো ব্যাংক খাত। ফলে অনেক ব্যাংক এখন ভোক্তা ঋণ বিতরণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি বছরে ব্যাংক খাতে ভোক্তা ঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধি পৌঁছেছে দুই অঙ্কে। যেখানে ফ্ল্যাট ও গাড়ি কেনার ঋণের শক্তিশালী চাহিদা ছিল মূল চালিকাশক্তি। পাশাপাশি ব্যবসা-সংক্রান্ত ঋণের জন্য ব্যাংকগুলো এখন গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রকল্প চালু করেছে, যার মধ্যে জামানতবিহীন ঋণও রয়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, চলতি বছরের জুনে ভোক্তা ঋণ ২৬ শতাংশ বেড়েছে। অথচ একই সময়ে সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে মোট ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৮ শতাংশ। এর মধ্যে অটো লোন বা গাড়ি কেনার ঋণ সর্বোচ্চ ৫৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং আবাসন ঋণে ৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। ব্যক্তিগত ঋণ ও ভোক্তা সামগ্রীÑ যেমন টিভি, ফ্রিজ, এসি, কম্পিউটার ও আসবাবÑ এসব খাতেও ঋণসুবিধা ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

২০২৫ সালের জুন শেষে দেশে মোট ভোক্তা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা। যা মোট ব্যাংকঋণের প্রায় ১০ শতাংশ। এক বছর আগে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বর্তমানে ভোক্তা ঋণে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ এবং নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। করপোরেট ঋণের দুর্বল চাহিদা বিবেচনায় নিকট ভবিষ্যতে এই হারও কমতে পারে বলে ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, সম্প্রতি ভোক্তা ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকগুলো ওইদিকেই মনোযোগ দিচ্ছে। ব্যবসায়িক ঋণ বিতরণে মন্দা থাকায় ব্যাংকগুলো ভোক্তা ঋণে ঝুঁকছে। ভোক্তা ঋণে খেলাপির হার তুলনামূলক কম। তাই ব্যক্তিগত ঋণগ্রহীতাদের দিকে আগ্রহ ব্যাংকগুলোর। 

বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যক্তি পর্যায়ে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা ব্যক্তিগত ঋণ, ৬০ লাখ টাকা অটো লোন এবং ২ কোটি টাকা পর্যন্ত হোম লোন নেওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ২০২৫ সালের জুনে ১০০ কোটি টাকার হোম লোন বিতরণ করেছে। যা তাদের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ বিতরণ। 

ব্যাংক খাতের ভোক্তা ঋণের মোট ৭ শতাংশেরও বেশি বাজার অংশীদারত্ব থাকা সিটি ব্যাংক ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

এদিকে গাড়ির ঋণ বিতরণেও বড় উত্থান হয়েছে। আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের কনজ্যুমার ডিভিশনের প্রধান মাহজেবিন বিনতে রহমান জানান, সেকেন্ডহ্যান্ড বা ব্যবহৃত গাড়ি কেনার জন্য ঋণ অনুমোদনের ফলে অটো লোনে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। যা আগে ছিল না। এই পরিবর্তনের ফলে এ খাতে ঋণচাহিদাও বেড়েছে। অস্থির সময়ের মধ্যে উচ্চমূল্যের গাড়ির বিক্রি কিছুটা কমলেও ২০২৫ সালে আইডিএলসির মোট অটো লোনের পোর্টফোলিও ১০ শতাংশ বেড়েছে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম বেড়ে যায়। এ অবস্থায় ভোক্তারা গাড়ির উচ্চমূল্য সামাল দিতে বেশি ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন। এ ঘটনাও ঋণের চাহিদা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে গাড়ির বাজার কমপক্ষে ১০ শতাংশ বেড়েছে এবং বছরের শেষদিকে আরও প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

অক্টোবরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট রিপোর্টে বলা হয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও প্রবাসী আয়ের রেকর্ড প্রবাহ ও শক্তিশালী রপ্তানি আয়কে ভিত্তি করে ব্যক্তি খাতে ভোগ ব্যয় ৫ শতাংশেরও বেশি সম্প্রসারিত হয়ে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৬ শতাংশ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে ভোগ ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি সামান্য কমে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এলেও ভোগ ব্যয় স্থিতিশীল রয়েছে এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে রপ্তানি খাত উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এই স্থিতিস্থাপকতার প্রতিফলন পাওয়া যায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভোগ্যপণ্যের আমদানি ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ার ঘটনায়, যা টানা দুই বছর আমদানি সংকোচনের পর প্রথমবার ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফেরে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা, পাশাপাশি দেশীয় ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাকার অবমূল্যায়ন, প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর টেকসই চাহিদা এবং প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে তৈরি পোশাকের অর্ডার বাংলাদেশে স্থানান্তর রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে আরও সমর্থন দিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে ব্যবসায়ীরা আরও বিনিয়োগের পূর্বে অপেক্ষা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের অবস্থান গ্রহণ করায় বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বলই রয়ে গেছে। 

এতে আরও বলা হয়, বেসরকারি বিনিয়োগে ২০২৫ সালের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূলধনি পণ্য ও যন্ত্রাংশ আমদানি ১০ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দুর্বল বিনিয়োগ কমে যায়। সরকারি বিনিয়োগও কমেছে। উন্নয়ন ব্যয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, যা প্রকল্প অনুমোদনে সরকারের সতর্ক অবস্থানকে তুলে ধরে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। মূলত মূল্যস্ফীতি কমে গেলে ব্যক্তি খাতের ভোগ ব্যয় আরও বাড়ার সম্ভাবনা। তবে বিনিয়োগ খাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা উন্নতি ঘটলেও সামগ্রিকভাবে দুর্বলই থাকবে। কারণ নির্বাচনী অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগকে চাপে রাখবে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক শুল্ক অনিশ্চয়তার মাঝেও শক্তিশালী থাকবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘করপোরেট খাতে ঋণচাহিদা কমে যাওয়ায় এ বছর ভোক্তা ঋণ বিতরণ বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সীমা বাড়িয়ে দেয়। এই সিদ্ধান্ত বেশ কাজেও দিয়েছে। ব্যাংকগুলোও এই খাতে ঋণ বিতরণ বাড়িয়ে দিয়েছে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা