প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৫ ২২:১১ পিএম
স্কুল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বাড়লেও কমছে শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়। গত জুলাইয়ে আমানত বাড়লেও কমেছে আগস্ট মাসে। তবে হিসাব সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, আগস্টে আমানত কমেছে ৬৯ কোটি টাকা। একই সময়ে হিসাবধারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৩ হাজার ৯২৭টি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে সামস্টিক অর্থনীতি বেশি ভালো নয়। এর প্রভাব পড়েছে স্কুল ব্যাংকিংয়েও। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সব টাকা খরচ করে ফেলছে শিক্ষার্থীরা, তাই তারা সঞ্চয় করতে পারছে না। আবার অনেকে ব্যয়ের কষাঘাতে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। অনেকে আবার হিসাব বন্ধ করে সব টাকা তুলে নিচ্ছে। তাই সার্বিকভাবে হিসাবের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। তবে সংকটের মধ্যেও ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা আমানতে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের আগস্টে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের আমানত ৬৯ কোটি কমে ২ হাজার ৫৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যা তার আগের মাস জুলাইতে ছিল ২ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। জুনে ছিল ২ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। মে মাসে আমানতের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসে আমানত ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা, ২ হাজার ৬ কোটি এবং ১ হাজার ৯৭৪ কোটি।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, সাধারণত যেকোনো শ্রেণির হিসাবে আমানত অল্প হলেও বাড়তে থাকে। কারণ কেউ যদি নতুন করে টাকা জমা নাও দেয় তবুও আগের জমাকৃত আমানতের সুদ যোগ হয়ে মোট অঙ্ক বাড়তে থাকে। আর যদি গ্রাহকরা তার মুনাফার টাকা উত্তোলন করে ফেলে, তাহলে হিসাব অপরিবর্তিত থাকে। তা ছাড়া নতুন খোলা হিসাবের আমানত যোগ হয়। আমানত কমে যাওয়ার অর্থ হলো নতুন করে যেসব হিসাব খোলা হয়েছে কিংবা আগের হিসাবে যে পরিমাণ টাকা জমা হয়েছে তারচেয়ে বেশি অঙ্কের টাকা উত্তোলন হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আর্থিক চাপের কারণে শিক্ষার্থীরাও তাদের সঞ্চয় ভেঙে ফেলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে চলা মূল্যস্ফীতির প্রভাবে অভিভাবকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফি ও অন্যান্য খরচ বাড়ায় অভিভাবকরা শিশুদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আগের মতো নিয়মিত সঞ্চয় রাখতে পারছেন না। পাশাপাশি, গত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় কিছু ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়, যার প্রভাব পড়েছে স্কুল ব্যাংকিংয়েও। তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বছরের শুরু ও শেষের দিকে অনেক পরিবার অর্থ ব্যয়ে ব্যস্ত থাকে যেমন-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বকেয়া ফি পরিশোধ, ভ্রমণ কিংবা অন্যান্য ব্যয়ের জন্য অনেকেই তখন অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে জানা গেছে, আগস্ট শেষে ব্যাংকে শিক্ষার্থীদের হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৪৮ হাজার ৯৫২টি। আগের মাস জুলাইয়ে হিসাব সংখ্যা ছিল ৪৫ লাখ ১৫ হাজার ২৫টি। সে হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ৩৩ হাজার ৯২৭টি। এর মধ্যে ছেলেদের হিসাব সংখ্যা ২৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৭৫টি এবং মেয়েদের হিসাব সংখ্যা ২২ লাখ ২২ হাজার ২৭৭টি। জুন মাসে মোট হিসাব সংখ্যা ছিল ৪৫ লাখ ৬ হাজার ৯৩৪টি। মে মাসে ছিল ৪৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৫০টি। ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসে হিসাব সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৪৪ লাখ ৫ হাজার ২৮৭টি, ৪৪ লাখ ২৬ হাজার ৯০ এবং ৪৪ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৭।
বর্তমানে দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৯টি স্কুল ব্যাংকিং চালু করেছে। ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা এই সুবিধা পেতে পারে। মাত্র ১০০ টাকা জমা রেখে এসব হিসাব খোলা যায়। এ ছাড়া অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন ধরনের ফি ও চার্জে ছাড়, বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডেবিট কার্ডসহ নানা সুবিধা রয়েছে।
উল্লেখ্য, শিক্ষার্থীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা ও তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০১০ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করে। এ কার্যক্রমের লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে টাকা জমানোর অভ্যাস তৈরি করা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তাদের আরও উপযোগী করে তোলা। এ পর্যন্ত ৫৯টি ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করেছে। ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিক্ষার্থীরা এ ধরনের অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। এই অ্যাকাউন্টগুলোর সঙ্গে বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। যেমন- সব ধরনের ফিস ও চার্জের ক্ষেত্রে রেয়াত পাওয়া, বিনা মূল্যে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া, ন্যূনতম স্থিতির বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে ছাড় ও স্বল্প খরচে ডেবিট কার্ড পাওয়ার সুযোগ। মাত্র ১০০ টাকা আমানত রেখেই এ ধরনের অ্যাকাউন্ট খোলা যায়।