ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৫ ২২:৩৭ পিএম
দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একীভূতকরণ ঘটল গত সপ্তাহে। আর্থিক বিপর্যয়ে পড়া পাঁচটি বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একত্রে মিশে জন্ম নিচ্ছে নতুন একটি রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংক; যার নাম ‘ইউনাইটেড ইসলামিক ব্যাংক’। এই ব্যাংকটি এখন থেকে সরকারের মালিকানাধীন হবে। তবে পরিচালনা কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা অনেকটাই বেসরকারি ধাঁচে চলবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এখানেই শুরু বিতর্ক, যেখানে রেগুলেটর অর্থাৎ সরকারের ব্যাংকিং বিভাগই হয়ে গেল অপারেটর। এ নিয়ে ব্যাংকিং জগতে তীব্র সমালোচনা চলছে।
অর্থ বিভাগের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচিবই চেয়ারপারসন
সূত্র বলছে, গত রবিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। পর্ষদের চেয়ারম্যান হয়েছেন সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। পরিচালনা পর্ষদে আরও ছয়জন শীর্ষ আমলাদের মধ্যে রয়েছেনÑ অর্থ বিভাগের সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব এম সাইফুল্লাহ পান্না, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল উদ্দিন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী, অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব রাশেদুল আমিন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব শেখ ফরিদ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ডের বিশেষ অনলাইন সভায় ব্যাংকটির লাইসেন্স লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) অনুমোদন করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যাংকটির প্রস্তাব পাঠানোর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই অনুমোদন পেয়ে যায় বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার ব্যাংক খাতের সংকট নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছেÑ এটি ইতিবাচক। তবে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন রেগুলেটর ও অপারেটর দুই ভূমিকাতেই থাকে, তখন স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। এটি সরকারের নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত।
বিশ্বব্যাংক ঢাকার সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব যদি একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন, তাহলে কার্যত তিনি নিজের অধীনস্থ বিভাগকে নিজেই নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে জবাবদিহিতা হারিয়ে যায়। ব্যাংক পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বেসরকারি বা পেশাদার ব্যক্তির পরিবর্তে সরকারি কর্মকর্তাদের বসানো- এটি ব্যাংকিং গভর্ন্যান্সের মূলনীতির পরিপন্থী।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ রেগুলেটর হিসেবে তারা যাকে দিয়ে তদারকি করাবে, সেই ব্যাংকের মালিক ও চেয়ারম্যান হচ্ছেন সরকারেরই একজন উচ্চপদস্থ সচিব।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিদর্শনে দেখা যায়, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম নিয়ন্ত্রণ করছিলেন গ্লোবাল, ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকÑ এই চারটি ইসলামী ব্যাংক। অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংক ছিল বিএবির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই ব্যাংকগুলোর মূল সমস্যার জায়গা ছিল, অতিরিক্ত সংযুক্ত ঋণ ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা এবং আমানতকারীদের আস্থার ঘাটতি।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সরকারি মালিকানা থাকলেও পরিচালনা যদি আমলাতান্ত্রিক হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হবে ধীর। উদ্ভাবনও থেমে যাবে। ব্যাংক ব্যবসা গতি চায়। কিন্তু আমলাতন্ত্রে তা খুব কম দেখা যায়। ফলে এ ব্যাংক দ্রুতই আরেকটি জনতা ব্যাংকের মতো অবস্থায় যেতে পারে।’
বেসরকারিকরণের প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সরকারি নিয়ন্ত্রণ বহাল
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, সরকারের পরিকল্পনা- প্রথমে ব্যাংকটি সরকারি মালিকানায় গঠন করা, পরে ধাপে ধাপে পুঁজিবাজারে শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানো। তবে সময়সীমা বা নির্দিষ্ট রোডম্যাপ এখনও ঘোষণা করা হয়নি। অন্যদিকে সরকার বলছে, এটি একটি ‘সংকট ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ’, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় মালিকানা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যেকোনো সরকারি উদ্যোগ একবার চালু হলে তা থেকে সরকারের সরে আসা খুবই দুরূহ হয়। এমন উদাহরণ আছে পূর্বে বেসিক ব্যাংক বা বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) ক্ষেত্রেও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত ফেরত দিতে না পারা, চট্টগ্রামকেন্দ্রিক প্রভাবশালী গ্রুপের প্রভাব এবং নগদ সংকট পুরো খাতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই সরকারের সিদ্ধান্তে দ্রুত একীভূতকরণই ছিল একমাত্র উপায়। তবে তিনি স্বীকার করেন, এখানে তদারকি ও পরিচালনার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। না হলে নতুন ব্যাংকটিও পুরনো সমস্যায় পড়বে। বাজারে স্থিতি আনতেই সিদ্ধান্ত।
কর্মীদের ভবিষ্যৎ ও আমানতকারীদের উদ্বেগ
একীভূত ব্যাংকের ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিলÑ পাঁচ ব্যাংকের হাজারো কর্মীর ভবিষ্যৎ কী হবে? গভর্নর জানান, কারও চাকরি যাবে না। তবে বাস্তবে একীভূত ব্যাংকের কাঠামোয় জনবল সমন্বয় অপরিহার্য।
অর্থাৎ একই পদে পাঁচজন থাকলে পুনর্গঠনের সময় একাধিক কর্মকর্তা হয়তো স্থানচ্যুত হতে পারেন। আমানতকারীরাও এখনও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নন। চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ী, যিনি ইউনিয়ন ব্যাংকে ৫ কোটি টাকা রেখেছিলেন তিনি বলেন, ‘সরকারি ব্যাংক হলে হয়তো নিরাপদ, কিন্তু মুনাফা বা সার্ভিস কীভাবে হবেÑ সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।’
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ইউনাইটেড ইসলামিক ব্যাংক হবে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক। অর্থাৎ একীভূত পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত আমানত প্রায় দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি।
এটি একদিকে বাজারে স্থিতি আনবে, অন্যদিকে সরকারের ব্যাংক খাতে নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, যদি সুশাসন, পেশাদারিত্ব ও স্বাধীন পরিচালনা নিশ্চিত না হয়, তাহলে এই ব্যাংকও হয়ে উঠতে পারে আরেকটি বেসিক ব্যাংক বা জনতা ব্যাংক, যেখানে আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক প্রভাব ও ঋণ খেলাপি সংস্কৃতি আবারও শিকড় গেড়ে বসতে পারে।