আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ২১:৩৯ পিএম
চড়া সুদ হওয়া সত্ত্বেও অক্টোবরে ব্যাংক খাতে কলমানিতে লাখো কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। চলমান তারল্য সংকটের কারণেই মূলত কলমানিতে লাখো কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। গত অক্টোবরে এ বাজারে (কলমানি মার্কেট) লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। বাজারে সেপ্টেম্বরের তুলনায় লেনদেন কমেছে ৬ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
গত অক্টোবরে কলমানির মধ্যে ওভার নাইটের গড় সুদহার (ডব্লিউএআর) ছিল ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ, শর্ট নোটিসের গড় সুদের হার ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং টার্ম কলে সুদের হার ছিল ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ। আর আন্তঃব্যাংক রেপোতে সুদের গড় হার ছিল ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে কলমানিতে লেনদেন কমেছে ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এই বাজারে লেনদেন কিছুটা কমলেও তা লাখো কোটি টাকার ওপরেই রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসের মধ্যে চার মাসই কলমানিতে লাখো কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।
কলমানি হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যে টাকা ধার দেওয়া-নেওয়ার একটি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় যেসব ব্যাংকের হাতে নগদ টাকার সংকট থাকে, তারা তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে যেসব ব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত তারল্য বা অর্থ থাকে, তাদের কাছ থেকে টাকা ধার করে। এজন্য সুদ দিতে হয়। সুদহার নির্ধারিত হয় চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে। ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে টাকা ধার দেওয়া-নেওয়া করলেও দিন শেষে লেনদেন ও সুদের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক কলমানি বাজারের প্রতিদিনের লেনদেন ও সুদের তথ্য প্রকাশ করে।
তবে বছর (অক্টোবর টু অক্টোবর) ব্যবধানে কলমানি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৬৩ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। তার মধ্যে একই সময়ে শুধু ওভার নাইট ধার বেড়েছে ৪৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। পাশাপাশি আন্তঃব্যাংক রেপোতে ধার বেড়েছে ৫৮ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। মূলত নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে চড়া সুদে স্বল্পকালীন ঋণ করায় অধিকাংশ ব্যাংক অস্বস্তিকর সময় পার করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে কলমানিতে সবচেয়ে বেশি টাকা ধার নেওয়া হয়েছে স্বল্প সময়ের জন্য। সর্বশেষ অক্টোবরে এই বাজারে লেনদেনের ৮৫ দশমিক ১৪ শতাংশই ছিল ওভার নাইট বা এক দিনের জন্য ধার। এক দিনের ধার হিসেবে লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকার। যা আগের মাসের তুলনায় ৫ দশমিক ০৭ শতাংশ কম। গত বছরের জুলাই থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত ১৬ মাসের মধ্যে এই প্রথম কলমানিতে ওভার নাইট বা স্বল্প সময়ের জন্য ধার লাখো কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ব্যাংক খাতের ১৪ থেকে ১৫টি ব্যাংক বর্তমানে তারল্য সংকটে ভুগছে। এ কারণে এসব ব্যাংক আমানতকারীদের আমানতের টাকাও ফেরত দিতে পারছে না। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পারলেও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো। ফলে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় এসব ব্যাংককেও অন্য ব্যাংক থেকে টাকা ধার করতে হচ্ছে। আবার ব্যাংক খাতের সার্বিক পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের একটি বড় অংশ ভালো ব্যাংকগুলোর প্রতি ঝুঁকছেন। ফলে ভালো ব্যাংকগুলোয় আমানতের বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। সে তুলনায় মাঝারি মানের ব্যাংকগুলোয় আমানত সেভাবে বাড়ছে না। যার কারণে মাঝারি মানের অনেক ব্যাংককেও দৈনন্দিন নানা প্রয়োজন মেটাতে কলমানিতে টাকা ধার করতে হচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতে মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক আমানতকারী প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে পারছেন না, যা ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় সংকট।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কলমানিতে তিন ধরনের মেয়াদে টাকা ধার দেওয়া হয়। এগুলো হলোÑ ওভার নাইট, শর্ট নোটিস ও টার্ম বা মেয়াদি কলমানি। ওভার নাইট হচ্ছে মূলত এক দিনের জন্য ধার, শর্ট নোটিসে ধারের মেয়াদ ২ থেকে ১৪ দিন। আর টার্ম বা মেয়াদি ধারের মেয়াদ ১৫ দিন থেকে এক বছর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি বছরের অক্টোবরে এক দিন মেয়াদি কলমানিতে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৬ হাজার ১৯২ কোটি টাকা কম; যা আগের মাসের তুলনায় ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম। তবে গত অর্থবছরের একই মাসে কলমানিতে ধার নেওয়া হয়েছিল ৮০ হাজার ২৩ কোটি টাকা। কলমানি লেনদেনে ৮৫ দশমিক ১৪ শতাংশ ছিলে এক দিন মেয়াদি। ১৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ ছিল স্বল্প সময়ের নোটিস এবং ১ দশমিক ২৭ শতাংশ ছিল টার্ম বা মেয়াদি কলমানি। এক দিন মেয়াদি কলমানি ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ; যা আগের মাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, আন্তঃব্যাংক রেপোর টার্নওভার ছিল ৭১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা; যা আগের মাসের তুলনায় ৩২ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। আন্তঃব্যাংক রেপোর ক্ষেত্রে ৭ দিনের মেয়াদ ছিল সর্বোচ্চ; যা ছিল ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং আগের মাস সেপ্টেম্বরে এটি ছিল ৩৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। এক দিন মেয়াদি কলমানি ছিল ৩১ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপোর টার্নওভার ছিল ৬১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা; যা আগের মাস সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশ কম। ১৪ দিনের মেয়াদি রেপোর মধ্যে প্রায় ৮৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ ছিল; যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় ৩৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। স্থায়ী ঋণ সুবিধার (এসডিএফ) ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংক ৮৫০ কোটি ১০ লাখ সুবিধা পেয়েছে; যা সেপ্টেম্বরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৪৫ কোটি টাকা বেশি এবং ৬৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা এসডিএফ সুবিধা ব্যবহার করেছে; যা আগের মাসের তুলনায় ৩০ হাজার ৪২২ কোটি টাকা বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে জানা গেছে, বিশেষ তারল্য সুবিধায় অক্টোবরে ৩৯ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা বিশেষ তরল্য সুবিধা পেয়েছে ব্যাংক খাত; যার মধ্যে ৪৫ দশমিক ৯২ শতাংশ ছিল নিশ্চিত তরল্য সহায়তা বা এএলএস। এদিকে সরকারি ট্রেজারি বিলের মোট পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা; যা সেপ্টেম্বরের তুলনায় ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ কম।