প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ২১:৪৬ পিএম
ফেনীর সোনাগাজীতে ২২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে খরচ কমানো হয়েছে ২৪৬ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) পর্যবেক্ষণের পর বিদ্যুৎ বিভাগ নতুন করে ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করে সংশোধিত প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এখন এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে সৌর প্যানেল ও ইনভার্টারের দাম কমে যাওয়ায় প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয়ও কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। ফলে সংশোধিত প্রস্তাবে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্পের যেসব খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ ছিল যেমনÑ প্রশাসনিক ভবন, বিশ্রামাগার, পরামর্শক সেবা ও পরিবহন খাতে কৃচ্ছ্রসাধন করলে প্রকল্পের মান অক্ষুণ্ন রেখেই খরচ কমানো সম্ভব।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি (ইজিসিবি)। অর্থের উৎস হিসেবে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) দেবে ১ হাজার ৬২৪ কোটি টাকার ঋণ, যা প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশ। সরকারি তহবিল থেকে আসবে ১৪৮ কোটি টাকা এবং ইজিসিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ১১৭ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও জ্বালানি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিভাগ সংশোধিত প্রস্তাব পাঠিয়েছে যেখানে ব্যয় প্রায় ১২ শতাংশ কমানো হয়েছে। এখন কমিশনের মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে। এটি একনেক সভায় উপস্থাপনের পর অনুমোদনের সম্ভাবনা রয়েছে।’
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানিয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সরকার ১৪৩ দশমিক ২৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আইডিবি ঋণের শর্ত অনুমোদন করে। পরে একই মাসে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও সেটি অনুমোদন দেয়। সংশোধিত প্রস্তাবে বিদেশি ঋণের অংশ রাখা হয়েছে ১৩৩ দশমিক ০৮ মিলিয়ন ডলার এবং অবশিষ্ট ১০ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার সংরক্ষিত থাকবে ভবিষ্যতে ২০ থেকে ২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য।
প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, এই প্রকল্প সেই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি দেশের সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা-২০২৩, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) এবং প্যারিস চুক্তির প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থা ইজিসিবি ইতোমধ্যে সোনাগাজীতে ৯৯৯ দশমিক ৬৫ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ২৮৫ একর জমিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়, যা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে উৎপাদন শুরু করেছে। নতুন ২২০ মেগাওয়াট প্লান্টটি গড়ে তোলা হবে বাকি ৬৩৪ একর জমিতে, যা একই এলাকায় বিদ্যমান প্লান্টের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে কাজ করবে।
২০১৮ সালে ভারতের আরই ফোর্স ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস, বাংলাদেশের ইকিউএমএস কনসালটিং লিমিটেড ও জার্মানির সানট্রেস যৌথভাবে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে সোনাগাজী অঞ্চলে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই করেছিল। এরপর ২০২১ সালের আগস্টে পরিবেশ ও ভূগোল তথ্যকেন্দ্র (সিইজিআইএস) বন্যাসংক্রান্ত ঝুঁকি সমীক্ষা সম্পন্ন করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) প্রকল্পের বিশেষ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে ২২০ মেগাওয়াট (এসি) ক্ষমতার প্লান্ট স্থাপনের সুপারিশ করে।
পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগ প্রাথমিকভাবে প্রশাসনিক ভবন, বিশ্রামাগার, ও অতিরিক্ত পরামর্শক ব্যয়ে যে বাজেট রেখেছিলÑ তা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় অগ্রাধিকারহীন ছিল। তাই এসব অংশ বাদ দিয়ে খরচ কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সঞ্চালন লাইন, ইনভার্টার, মডিউল এবং সাবস্টেশন নির্মাণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদর হালনাগাদ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যয় কমানোর ফলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন গতিও বাড়বে, এখন আইডিবি ঋণছাড়ের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা যাবে। পরিকল্পনা কমিশনও বলছে, এই সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের আর্থিক দক্ষতা বাড়বে এবং বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে সোনাগাজী প্লান্টটি সবচেয়ে বড় সৌর প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ২০০-২৫০ জনের কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, খরচ কমানোর পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নকালেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক কার্যক্রম হিসেবে নকশা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি চলছে।