প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৫ ২২:২০ পিএম
রাজনৈতিক রূপান্তরের পর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা অনেক দেশের জন্যই কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম বছরেই বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা একই ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হওয়া অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, আর্থিক নীতির স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এ সাফল্যের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সোমবার (৩ নভেম্বর) বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিশ্বব্যাংক ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বে যেসব দেশে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, সেসব দেশে পরবর্তী এক বছরে এফডিআই উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। উদাহরণস্বরূপ এই একই সময়ে (২০২২ সালের পর) শ্রীলঙ্কায় বিনিয়োগ কমেছে ১৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ, চিলিতে কমেছে ২০১৯ সালের পর ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ, সুদানে ২০২১ সালের পর কমেছে ২৭ দশমিক ৬০ শতাংশ, ইউক্রেনে ২০১৪ সালের পর কমেছে ৮১ দশমিক ২১ শতাংশ, মিসরে ২০১১ সালের অভ্যুত্থানের পর কমেছে ১০৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৯৮ সালের পর কমেছে ১৫১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এই ধারাবাহিক পতনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিনিয়োগে উত্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক বিস্ময়কর উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গুণ হলো শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাউন্স ব্যাক করার অদ্ভুত ক্ষমতা। এই পরিসংখ্যানটি তার দারুণ প্রতিফলন। সাধারণত গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ প্রচণ্ডভাবে হ্রাস পায়। কিন্তু আমরা দেখছি উল্টো।’
তিনি আরও বলেন, ‘সঠিক অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আন্তরিকতা এবং আমাদের বেসরকারি খাতের অদম্য স্পৃহা; সব মিলিয়ে এই সাফল্য এসেছে। আমরা সব সময় বিনিয়োগকারীদের সহায়তা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। সব সমস্যার সমাধান অবশ্যই হয়নি। কিন্তু সদিচ্ছার কোনো ত্রুটি ছিল না। আমরা শিগগিরই আমাদের সারা বছরের একটি আমলনামা (রিপোর্ট কার্ড) প্রকাশ করব।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ৪৮৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭০ দশমিক ৭ মিলিয়নে। ২০২৩ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ পৌঁছায় ৯২৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলারে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক মন্দা ও মুদ্রা বাজারে অস্থিরতার প্রভাবে কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৬৭৬ দশমিক ৬ মিলিয়নে। কিন্তু ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯২ দশমিক ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই প্রবৃদ্ধি বছরের শেষে আরও বাড়বে বলে ধারণা দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহল।
বিনিয়োগ প্রবাহের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে পরিবর্তন। আগে যেখানে অধিকাংশ বিদেশি বিনিয়োগ যেত টেলিকম ও গার্মেন্টস খাতে, এখন তা ধীরে ধীরে বৈচিত্র্য পাচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, নির্মাণ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ খাতেই চলতি অর্থবছরে ৩০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ অনুমোদিত হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশি অংশীদারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে ১২ শতাংশ হারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগে এই উত্থান কেবল আস্থার পুনর্গঠন নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি কার্যকর সূচক। বাংলাদেশ ব্যাংকের শিথিল মুদ্রানীতি, এনবিআরের কর প্রণোদনা, অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের অগ্রাধিকার এবং বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণের পদক্ষেপ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তারা বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ঝুঁকি পর্যালোচনায় মনোযোগী থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দ্রুত স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে ওঠায় বিনিয়োগকারীরা পুনরায় সক্রিয় হয়েছেন। এটি শুধু আর্থিক সূচকের উন্নতি নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তারও নিদর্শন।’
সরকারের অর্থনৈতিক কৌশল এখন বিনিয়োগবান্ধব নীতিকে আরও গভীর করতে মনোনিবেশ করছে। বিশেষ করে, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পপার্ক এবং এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনগুলোতে নতুন বিনিয়োগের অনুমোদন দ্রুত দেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা অঞ্চলে চলমান অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর কারণে লজিস্টিক খরচ কমে যাওয়ায় বিদেশি কোম্পানিগুলো উৎপাদন ঘাঁটি সরিয়ে আনার আগ্রহ দেখাচ্ছে।