বিশ্বব্যাংকের আউটলুক
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৫ ২২:২৫ পিএম
বিশ্ববাজারে সামগ্রিক পণ্যমূল্য কমলেও কৃষিপণ্যের অন্যতম উপাদান সার এখনও কৃষকের জন্য বড় চাপ হয়ে আছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকবে এবং ২০২৬ সালে আরও কমবে। কিন্তু একই সময়ে সারের দাম বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। চাহিদা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সরবরাহ সংকটের কারণে এই খাতের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক, অক্টোবর ২০২৫’ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছর সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য ৭ শতাংশ কমছে। আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে আরও ৭ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। এ প্রবণতায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে জ্বালানির দামে পতন। তেলের দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদন ও পরিবহন খরচ হ্রাস পাচ্ছে। ফলে খাদ্যপণ্যের বাজারে তুলনামূলক স্বস্তি এসেছে। তবে সারের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত।
চলতি বছর সারের বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নাইট্রোজেন, ফসফেট ও পটাশজাত সারÑ তিনটিরই সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চীন ইতোমধ্যে নাইট্রোজেন ও ফসফেট সার রপ্তানিতে সীমিত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে রাশিয়া ও বেলারুশ, যাদের মধ্যে বেলারুশ বিশ্বের অন্যতম পটাশ সরবরাহকারী। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, যা দাম বাড়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৬ সালে সারের দাম কিছুটা কমে আসতে পারে। কিন্তু ২০১৫-১৯ সালের গড় দামের তুলনায় তা এখনও অনেক বেশি থাকবে। এর পেছনে মূল কারণ হলো উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের উচ্চমূল্য এবং রপ্তানি সীমাবদ্ধতা। গ্যাসের দাম বাড়ায় ইউরিয়া উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। এদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষি উৎপাদন নির্ভর করে সারের সহজলভ্যতার ওপর, ফলে দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্য উৎপাদনে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কৃষিপণ্যের মূল্যসূচক মোটামুটি স্থিতিশীল থাকবে। ২০২৬ সালে তা সামান্য ২ শতাংশ ও ২০২৭ সালে আরও ১ শতাংশ কমবে। শস্য, তেলবীজ, প্রোটিনজাত খাবারসহ প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম সাম্প্রতিক সীমার কাছাকাছি থাকবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে আবহাওয়ার প্রভাবে সাময়িক ওঠানামা হতে পারে। যেমনÑ ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পানীয় ও কিছু কৃষিপণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রধান কৃষিপণ্যগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে আবার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় ফিরে আসছে। সয়াবিন, ভুট্টা ও গমের উৎপাদন বাড়ায় খাদ্যবাজারে স্থিতিশীলতা আসছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের উৎপাদন বাড়ছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের বাজার চীনের চাহিদা হ্রাসের কারণে সংকুচিত হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন অন্য ক্রেতাদের কাছে কম দামে সয়াবিন বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে কৃষকের লাভজনকতা নির্ভর করে শুধু পণ্যের বিক্রিমূল্যের ওপর নয়, উৎপাদন খরচের ওপরও। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে বৈষম্য। বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কমছে, অথচ সার, জ্বালানি ও শ্রমের খরচ বাড়ছে। এতে কৃষকের প্রকৃত লাভ কমে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃষি ভর্তুকি বাড়াতে হচ্ছে, যা বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই প্রভাব স্পষ্ট। আমদানিনির্ভর সার খাতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তা স্থানীয় বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। কারণ সরকার ভর্তুকি দিয়ে দাম স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে দাম বেশি থাকলে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়ে, যা সামগ্রিক রাজস্ব ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। অর্থনৈতিক বছর ২০২৫-২৬ এ সারের ভর্তুকিতে বরাদ্দ বাড়ানো লাগতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে এখনও দামের পতনের ইঙ্গিত নেই।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যদিও ২০২৬ ও ২০২৭ সালে সারের দাম সামান্য ৫ শতাংশ কমতে পারে, তবুও তা আগের দশকের গড় দামের তুলনায় ৪০-৫০ শতাংশ বেশি থাকবে। অর্থাৎ কৃষক ও সরকারÑ উভয়কেই বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের দাম কমে গেলেও কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক হারে না কমায় কৃষকের হাতে প্রকৃত লাভের অংশ কমবে।