প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:৫১ পিএম
আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৬:১৮ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ কোরিয়ায় হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠক এখন বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ঘটনা। আগামী বৃহস্পতিবারের এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে কী কী সামনে আসছে, তা দেখতে উন্মুখ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এই বৈঠককে নতুন ‘ট্রেড ক্যালকুলাস’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
কারণ ট্রাম্প চীন সফরে যাচ্ছেনÑ এমন একসময়, যখন দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য যুদ্ধ আবারও নতুন উত্তেজনার মুখে, যা মূলত মার্কিন এই প্রেসিডেন্টই ঘটিয়েছেন। তবে এবার ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে বলছে, তারা উত্তেজনা বাড়াতে নয়, বরং তা ‘নিয়ন্ত্রণে রাখতে’ চায়।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একটি সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো নিয়ে একমত হয়েছে, যা নিয়ে চলতি সপ্তাহেই দেশ দুটির শীর্ষ নেতারা আলোচনা করবেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি সমঝোতা খুঁজছি, যা দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ককে টেকসই পর্যায়ে নিয়ে যাবে।’ ‘শুল্ক এড়ানো হবে,’ যোগ করেন তিনি।
স্কট বেসেন্ট সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের কার্যক্রম ও বিরল খনিজের ওপর চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ স্থগিতের ব্যাপারে ‘চূড়ান্ত চুক্তির’ বিষয়ও রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি বা সমঝোতার ভেতরে লুকিয়ে আছে বৈশ্বিক কাঁচামাল সরবরাহ, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য পুনর্গঠনের বৃহৎ কৌশল।
কী ধরনের সমঝোতা হতে পারে
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই এখন প্রবল প্রচারে রয়েছে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও রেয়ার আর্থ নামক খনিজ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, দুই দেশ একটি ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ চুক্তির খসড়ায় পৌঁছেছে, যা ভবিষ্যতে বড় বাণিজ্য চুক্তির ভিত্তি হতে পারে।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশÑ মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে দ্রুত নতুন চুক্তি করেছে। রয়টার্স বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সংকটপূর্ণ খনিজের সরবরাহকে চীননির্ভরতা থেকে সরিয়ে আঞ্চলিকভাবে বৈচিত্র্যময় করা। চীন রেয়ার আর্থ রপ্তানিতে নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও প্রতিরক্ষা সরবরাহ চেইনে চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে টিকটক, যার মার্কিন অপারেশন চুক্তি নিয়ে দুই দেশ দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছাচ্ছে। চীনা সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, দুই দেশের আলোচক দল তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে একটি মৌলিক সমঝোতায় পৌঁছেছে।
‘উভয় পক্ষই বিস্তারিত আরও চূড়ান্ত করতে একমত হয়েছে,’ বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, বড় বিজনেস-ডিলগুলো ঘুরছে বাণিজ্য শুল্ক হ্রাস, রেয়ার আর্থ সরবরাহ ও প্রযুক্তি কোম্পানির বাজার প্রবেশাধিকারÑ এই তিন ক্ষেত্র ঘিরে।
পেছনের কারণ ও কৌশলগত প্রেক্ষাপট
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে আসছে, চীন ‘অন্যায্য বাণিজ্যনীতি’ অনুসরণ করছে এবং বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি করছে। রয়টার্স অনুসারে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই এ অভিযোগ তার রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার।
অন্যদিকে চীন রেয়ার আর্থ ও উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করেছে, যা শুধু বাণিজ্য নয়; প্রযুক্তিগত ও সামরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। ট্রাম্প বলেছেন, চীন বিরল খনিজ রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করলে তিনি নভেম্বর থেকে চীনা পণ্যে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন। তিনি বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বকে জিম্মি করার চেষ্টার’ অভিযোগ এনেছেন।
চীন বিশ্বের বিরল খনিজের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করে। এটি সোলার প্যানেল থেকে শুরু করে স্মার্ট ফোনÑ সবকিছুতেই ব্যবহার করা হয়। এর আগে ট্রাম্প চীনা পণ্যে শুল্ক বাড়ানোর পর বেইজিং এই খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। ফলে যেসব মার্কিন কোম্পানি এটি নিয়ে কাজ করে, তারা সোচ্চার হয়ে উঠেছে। আবার চীন যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হলে চীন আগের সব ক্রয় আদেশ বাতিল করে দেয়, যা মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বেসেন্ট এই পরিস্থিতির অবসানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।
‘আমি একজন সয়াবিন কৃষক, সে কারণে এর কষ্ট বুঝি...আমার মনে হয় আমরা কৃষকদের উদ্বেগের বিষয়গুলোতে নজর দিয়েছি,’ চলতি সপ্তাহেই বিবিসিকে বলেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি চীনের সাথে চুক্তির বিষয়টি যখন ঘোষণা হবে তখন সয়াবিন চাষিরা ভালো বোধ করবেন। যুক্তরাষ্ট্রে ভিডিও শেয়ারিং প্লাটফর্ম টিকটক নিয়ে একটি চুক্তির বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন বেসেন্ট।
জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে চীনা মূল কোম্পানি বাইটড্যান্সের হাত থেকে টিকটকের কার্যক্রমের মালিকানা নিতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। টিকটককে এর আগে যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, তাদের মার্কিন কার্যক্রম বিক্রি করতে হবে, অন্যথায় এটি সেখানে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে ট্রাম্প চার দফায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের বিষয়টি বিলম্বিত করেছেন। এখন তিনি ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন সময়সীমা ঠিক করে দিয়েছেন।
দুই দেশের প্রতিযোগিতা এখন অর্থনীতির বাইরে গিয়ে ভূরাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে টাইম জানিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন কৌশল হলো, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে যুক্তরাষ্ট্রে শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্ত করা। সিবিএস নিউজ মন্তব্য করেছে, ‘ট্রাম্প এবার কনফ্রন্টেশনের বদলে ক্যালকুলেটেড এনগেজমেন্টে যাচ্ছেন।’
ভবিষ্যতে কী হতে পারে
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, আসন্ন এশিয়া সফরের সময় ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি প্রায় প্রস্তুত। তবে এটি সম্পূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি নয়, বরং বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন ‘প্রথম ধাপ’ বলেÑ বিষয়টি জানিয়েছে টাইম।
সম্ভাব্য চুক্তির ফলে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও কৃষিপণ্য, সয়াবিন ও কর্ন কিনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র রেয়ার আর্থ বিকল্প উৎস খুঁজে সরবরাহ চেইনে চীনের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করবে।
এটা বলা যায়, শুল্ক বা বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতায় কিছু স্বস্তি মিললেও তা হয়তো সাময়িক। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সমঝোতা রাজনৈতিক স্থিতির ওপর নির্ভরশীল; দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এখনও অনিশ্চিত। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এতে নতুন সুযোগও রয়েছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক স্থিতিশীল হলে সরবরাহ চেইন, রপ্তানি ও প্রযুক্তি অংশীদারত্বে আঞ্চলিক শিল্প খাত নতুন সম্ভাবনা দেখতে পারে। তবে একই সঙ্গে বাড়বে ভূরাজনৈতিক জটিলতা, বিশেষত তাইওয়ান ও সাউথ চায়না সি ইস্যু ঘিরে।
ট্রাম্প-চীন বৈঠকের পেছনে মূল লক্ষ্য শুধু বাণিজ্য নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রভাব ও কৌশলগত ভারসাম্য পুনর্গঠন। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চীনের বিশাল মার্কেট অ্যাকসেস ও সরবরাহ-নিয়ন্ত্রণ শিথিল হোক; চীন চাইছে বৈদেশিক চাপের মধ্যেও অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে।
বিশ্বজুড়ে তাই এই বৈঠককে দেখা হচ্ছে এক নতুন ‘ট্রেড ক্যালকুলাস’ হিসেবে; যেখানে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতি এক নতুন জটিল ভারসাম্যে পৌঁছতে চলেছে।