ভোজ্য তেল
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১২:২৫ পিএম
চাহিদামতো মিলছে না বোতলজাত সয়াবিন তেল। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত বোতলজাত সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না। বাজারে ক্রেতার ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। স্থানীয় বাজারে মুদি দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বোতলজাত সয়াবিন তেল আগের দামে বিক্রি হলেও সরবরাহ সংকট তৈরি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। মূলত রিফাইনাররা বাজারে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ না করায় কাঁচাবাজার থেকে একপ্রকার উধাও হয়ে যাচ্ছে রান্নার এই উপকরণটি।
সম্প্রতি বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ছয় টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু সরকার তাতে সায় না দেওয়ায় দাম বাড়াতে পারেননি মিল মালিকরা। এতে সংগঠনটি গত ১৩ অক্টোবর দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও তা কার্যকর হয়নি। বাজারে বোতলজাত সয়াবিন এক লিটার ১৮৯ টাকায়, দুই লিটার ৩৭৮ টাকায় এবং ৫ লিটার ৯২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কাজিরদেউরি বাজারের সাদিয়া ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালিক শামসুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম এখনও বাড়েনি। তবে আমরা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছি না। চলতি সপ্তাহে অর্ডার দিয়েও রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেলের এক এবং দুই লিটারের বোতল পাইনি। শুধু ৫ লিটারের বোতল সরবরাহ করা হয়েছে।’
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন জীবন গ্রোসারির মালিক ইসমাইল হোসেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এখনও আগের রেটই বহাল আছে। তবে কোম্পানিগুলো বাজারে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। কোনো দোকানে এক লিটারের বোতল সরবরাহ করলে ওই দোকানে দুই এবং পাঁচ লিটারের বোতল সরবরাহ করছে না। আবার যেখানে ৫ লিটারের বোতল সরবরাহ করছে সেখানে এক এবং দুই লিটারের বোতল সরবরাহ করছে না।’
সামনে সরবরাহ সংকট হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোম্পানিগুলো থেকে এ ধরনের ইঙ্গিতই পাচ্ছি। অর্ডার কাটতে আসা কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা বলছেন, সামনে ভোজ্য তেলের সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে।’
১৩ অক্টোবর ভোজ্য তেলের দাম বাড়িয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। এতে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৮৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৫ টাকা, খোলা সয়াবিনের দাম তিন টাকা বাড়িয়ে ১৭৭ টাকা এবং পাম তেলের দাম ১৩ টাকা বাড়িয়ে ১৬৩ টাকা করা হয়। এ ছাড়া ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করা হয় ৯৪৫ টাকা। অভিযোগ উঠেছে, বর্ধিত এই দাম কার্যকরে সরকারি অনুমোদন পেতেই বাজারে তেল সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
অথচ সয়াবিন তেল আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের গত চার মাসে দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি ভোজ্য তেল আমদানি হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে ভোজ্য তেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিক টন। সেখানে চলতি অর্থবছরের ২০ অক্টোবর পর্যন্ত গত ৩ মাস ২০ দিনে দেশে ভোজ্য তেল (পাম অয়েল এবং সয়াবিন) আমদানি হয়েছে ১১ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত সয়াবিন তেল ও পাম অয়েল আমদানি হয়েছে ১১ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন। যার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করেছে বাংলাদেশ এডিবল অয়েল, সিটি এডিবল অয়েল লিমিটেড, শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, সুপার অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড, সোনারগাঁ সিডস ক্রাশিং মিলস লিমিটেড, সেনা এডিবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রি, অ্যাস্ট্রো ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড এবং বে ফিশিং করপোরেশন লিমিটেড।
আমদানি বেশি হওয়ার পর বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরির পেছনের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ভোজ্য তেল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দোকানি ব্যবসায়ীরা বলেন, বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের ঘোষণা করা তেলের দাম বৃদ্ধিতে সরকার সায় না দেওয়াতেই পরিকল্পিতভাবে বাজারে তেলের সরবরাহ সংকট তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে কয়েকটি কোম্পানি। গত এক সপ্তাহ ধরে কোম্পানিগুলো খুচরা ব্যবসায়ীদের চাহিদামতো তেল সরবরাহ করছেন না।
এদিকে সরবরাহ সংকট তৈরি করে ভোজ্য তেল ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলেও আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুলাই এবং আগস্টের তুলনায় গত দুই মাস আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম স্বাভাবিক রয়েছে। মাঝেমধ্যে দাম সামান্য ওঠানামা করলে প্রতি কেজি ১ দশমিক ১০ ডলারের ওপরে যায়নি। প্রতি কেজির দাম ১ দশমিক ০৫ ডলার থেকে ১ দশমিক ১০ ডলারের মধ্যে ছিল।
আমদানি স্বাভাবিক থাকার পরও বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ কেন কমছে জানতে সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইলে কল রিসিভ করেননি।