দুর্নীতি
কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২১ এএম
খনিজ সম্পদ পাথর ও কয়লা উত্তোলনে নিম্নমানের বিস্ফোরক আমদানির অভিযোগ উঠেছে পেট্রোবাংলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) বিরুদ্ধে। সরকারের অভ্যন্তরে থাকা একটি গোষ্ঠী নিজস্ব ফায়দা হাসিলের জন্য দাম কম বলে প্রায় দুইশ টন নিম্নমানের বিস্ফোরক আমদানি করছে ভারতীয় বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান সুপার শিব শক্তি কেমিক্যালস থেকে। এই বিস্ফোরক ব্যবহার করা হবে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির পাথর উত্তোলন প্রকল্পে। ভারতীয় নিম্নমানের বিস্ফোরক পরিবেশ এবং খনির জন্য বিপজ্জনক উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন উদ্যোগ দেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে। নিম্নমানের বিস্ফোরক মানবজীবন, পরিবেশ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। নষ্ট হবে ভূগর্ভস্থ মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ।
পেট্রোবাংলার বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করে বলেন, এবারে যে মানের বিস্ফোরক আনা হচ্ছে, তা খুবই নিম্ন মানের। আন্তর্জাতিক বাজারে এ ধরনের বিস্ফোরকের বাজারদর কোনোভাবেই ৮০০ থেকে ৯০০ ডলারের বেশি নয়। অথচ এগুলো আনা হচ্ছে টনপ্রতি ১ হাজার ৭৫০ ডলারে। আর এতে কতিপয় সরকারি কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেন। অভিযোগ উঠেছে, থাইল্যান্ডে বসে এক মধ্যস্বত্ত্বভোগী দেশে নিম্নমানের ভারতীয় বিস্ফোরক সরবরাহ করছেন।
সূত্র জানায়, নিম্নমানের বিস্ফোরক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে একটি বিতর্কিত ভারতীয় প্রতিষ্ঠান সুপার শিব শক্তি কেমিক্যালস। ইতঃপূর্বে বিভিন্ন সময়ে নিম্নমানের বিস্ফোরক তৈরির কারণে দেশটির পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভ সেফটি অর্গানাইজেশন (পিইএসও) শিব শক্তির লাইসেন্স স্থগিতের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তদন্তও করেছে। ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে সিবিআই ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শিব শক্তির একজন পরিচালক ও পিইএসওর দুজন ডেপুটি চিফকে গ্রেপ্তার করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির বিস্ফোরক ব্যবহারে বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। আর্থিক অনিয়মের কারণে ব্যাংক কর্তৃক ভারতে শিব শক্তিকে দেউলিয়াও ঘোষণা করা হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের বিস্ফোরক আমদানি করতে হয় ভারত, চীন, রাশিয়া বা চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাম কম থাকায় প্রতিবেশী দেশ থেকেই বিস্ফোরক আমদানি করা হয়। তবে এবারে সুপার শিব শক্তি কেমিক্যালস লিমিটেড থেকে যে বিস্ফোরক আনা হচ্ছে তা খুবই নিম্নমানের। ফলে দামও কম। এগুলো আনা হচ্ছে টনপ্রতি ১ হাজার ৭৫০ ডলার। তবে মাত্র এক মাস আগেই এই প্রতিষ্ঠানটি আমাদের থেকে টনপ্রতি বিস্ফোরকের দাম রেখেছিল ২ হাজার ৯০ ডলার।
জানা যায়, দিনাজপুরের পার্বতীপুরে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি থেকে পাথর এবং বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কয়লা আহরণের কাজে ব্যবহারের জন্য দৈনিক আড়াই থেকে তিন টন হিসাবে বছরে ৮০০ থেকে ৯০০ মেট্রিক টন বিস্ফোরক আমদানি করে খনি কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে বড়পুকুরিয়ায় স্বল্প পরিমাণ ইমালশন ও ডিটেনেটর ব্যবহার করা হয়। আর মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনিতে পাথর উত্তোলনে ব্যবহার হয় ইমালশন, ডেটেনেটর ও অ্যামুনিয়াম বিস্ফোরক। এ ছাড়া খনি অনুসন্ধানের সিসমিক জরিপেও সীমিত পরিমাণে বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাম কমের দিকে তাকালে দেশকে ভয়াবহ মাশুল গুনতে হতে পারে। কেননা ভূগর্ভস্থ পাথর ও কয়লা উত্তোলন প্রক্রিয়া জটিল এবং সুনির্দিষ্ট সেফটি নির্দেশনা অনুসরণ না করলে, অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের আশঙ্কা থাকে। আর বিস্ফোরণ ঘটলে প্রাণহানির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ সম্পদের ক্ষতি এবং পরিবেশ বিপর্যয়েরও আশঙ্কা দেখা দেয়। সম্প্রতি বড়পুকুরিয়ায় একটি নিম্নমানের অবিস্ফোরিত ডিটেনেটর ডাম্পিং উপকরণের সঙ্গে বাইরে ফেলে দেওয়া হলে এক শিশু সেটি নাড়াচাড়া করার সময়ে বিস্ফোরণে তার কব্জি উড়ে যায়।
ভারতীয় প্রতিষ্ঠান থেকে বিস্ফোরক আমদানি প্রসঙ্গে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী ডিএম জোবাইয়ের হোসেন বলেন, ‘ভারত থেকে আমদানি করা বিস্ফোরক দ্রব্য (অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট) বন্দরে এসে পৌঁছেছে। কাস্টমস ক্লিয়ারিং শেষে এসব বিস্ফোরক বন্দর থেকে খনিতে এনে কার্যক্রম শুরু করতে দুই-তিন দিন লাগবে।’
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের মোবাইল ফোনে এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে চেয়ারম্যান শাখার উপব্যবস্থাপক সৈকত মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ছোটখাটো বিষয় পেট্রোবাংলা পর্যন্ত আসে না। আমাদের অধীনে ১১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারা নিজ নিজভাবে কাজ করে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরাই ভালো বলতে পারবে। আমরা বিষয়টি জানি না।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নিম্নমানের বিস্ফোরণজনিত কার্যক্রম একদিকে মাটি, পানি ও বায়ুর মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে। অন্যদিকে উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের জীবনও বিপন্ন করবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বিস্ফোরণ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণ ও পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন জরুরি। অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের কাজ এগিয়ে নেওয়া জনগণের জীবনে সরাসরি বিপদ ডেকে আনবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা ব্যর্থতা শুধু জনজীবন নয়, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।’