আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৪৮ এএম
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমছে। এর সঙ্গে কমছে ঋণের চাহিদাও। এতে ব্যাংক খাতে অলস টাকার পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। ফলে বিনিয়োগ কমতে থাকায় নগদ অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিম্নমুখী প্রবণতার পরেও ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। ফলে ব্যাংকের ভল্টে থাকা নগদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছরের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে এখনও বিনিয়োগের পরিবেশ স্বাভাবিক হয়নি। ফলে নতুন ঋণ নেওয়া কমে গেছে, আর তার প্রভাবেই ব্যাংকে অলস টাকা আরও বেড়ে গেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণত আমানতকারীদের দৈনন্দিন অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে তাদের ভল্টে তারল্যের একটি অংশ রাখে, যাকে বিনিয়োগহীন নগদ বলা হয়।
শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থার পতনের পর জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাংক খাতে এই জাতীয় অর্থের মজুদে ব্যাপক পতন দেখা দেয়। রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের পর বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে, বেশিরভাগই অপ্রচলিত ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক ঋণ সম্পর্কিত অনিয়ম আলোচনায় আসে। যার ফলে এই ধরনের ব্যাংকগুলো থেকে আমানত উত্তোলনের আতঙ্ক দেখা দেয়। ফলে তাদের ব্যাংক ভল্টে বিনিয়োগহীন নগদের পরিমাণ চরমভাবে চাপের মধ্যে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের জুন মাসের শেষে ব্যাংক খাতের বিনিয়োগহীন অতিরিক্ত নগদের পরিমাণ ১৯ হাজার ৩২৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি, মার্চ এবং জুন মাসে এই সংখ্যা যথাক্রমে ২ হাজার ৬৯ কোটি, ২৬ হাজার ৮০ কোটি এবং ৩১ হাজার ৯০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে আমানতের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে বেসরকারি খাতের ঋণ চাহিদা কম থাকায় তারা একই পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারছে না। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার বৈদেশিক মুদ্রাবাজার হস্তক্ষেপ কৌশলের অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা কেনার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণে তারল্য সঞ্চার করেছে।
তিনি বলেন, এই বিষয়গুলো মূলত বেশিরভাগ ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির উন্নতিতে সহায়তা করে। এ কারণেই এই ধরনের বিনিয়োগহীন নগদের পরিমাণ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৩ জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে ২১২ দশমিক ৬ কোটি ডলার কিনেছে এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার জন্য বাজারে প্রায় ২৫ হাজার ৯০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, ‘ঈদ এবং পূজার পর তরল তহবিলের একটি অংশ ব্যাংকগুলোতে পুনরায় জমা করা হয়েছে; যা আর্থিক কার্যকলাপ বৃদ্ধির প্রতিফলন।’
তিনি বলেন, ‘তহবিল মূলত আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে, যার ফলে হুন্ডি চ্যানেলের ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ অর্থ পাচার হ্রাস ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈধ তহবিলের প্রবাহকে আরও বাড়িয়েছে।’
ব্যাংকারদের মতে, সঞ্চয়পত্র এবং ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার হ্রাসের ফলে অনেক বিনিয়োগকারী এই উপকরণগুলো বাতিল করে ব্যাংকগুলোতে তহবিল জমা করতে উৎসাহিত হয়েছেন। যার ফলে তারল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ব্যাংকের বাইরে মুদ্রার পরিমাণ আগস্ট মাসে ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে; যা ২০২৫ সালের জুন মাসে ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে আরও দেখা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ০১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; যা জুন মাসে ছিল ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি আগস্ট মাসে ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে; যা এক বছর আগেও ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত জুলাই শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। আগস্ট শেষে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ চার হাজার ৭৪০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে (জুলাই-আগস্ট) ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে ২৪ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। এক বছর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৩১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে প্রায় এক লাখ ৭৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ডলার কেনায় ব্যাংকগুলোয় নগদ টাকার পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু ঋণের চাহিদা না থাকায় অলস তারল্য আরও বেড়ে গেছে।
বর্তমানে ট্রেজারি বিলের সুদের হার এক অঙ্কে নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ নিলাম অনুযায়ী ৯১ হাজার ১৮২ ও ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদের হার দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ, ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং ৯ দশমিক ৬০ শতাংশে। এ ছাড়া ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার যথাক্রমে ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ৯ দশমিক ৭০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, ব্যাংকে আমানত আগের চেয়ে সামান্য বেড়েছে, তবে তারল্য বেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। তিনি বলেন, ‘মূলত করপোরেট ঋণের চাহিদা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কেনায় বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়েছে। সব মিলিয়ে তারল্য উদ্বৃত্ত হয়েছে।’