এমএফএস
আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৩৩ এএম
দেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) খাতের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। নগদ অর্থ লেনদেনের পাশাপাশি এখন বিল পরিশোধ, বেতন প্রদান, রেমিট্যান্স গ্রহণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আর্থিক সেবা দিচ্ছে এসব প্লাটফর্ম। চলতি ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে এমএফএসে লেনদেন হয়েছে এক লাখ ৫১ হাজার ১২৩ কোটি টাকা, যা জুলাইয়ের তুলনায় ২ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা বেশি। একই সময়ে নতুন গ্রাহক বেড়েছে আরও ৬ লাখ ৩৯ হাজার জন। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সহজতা ও দ্রুততার কারণে এমএফএস এখন দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের নাগালে পৌঁছে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে লেনদেন হয়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। আগের মাস জুনে লেনদেন হয়েছে এক লাখ ৪৬ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। মে-তে হয়েছে এক লাখ ৫৪ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। মার্চ ও এপ্রিল মাসে লেনদেন হয়েছে যথাক্রমে এক লাখ ৭৮ হাজার ১২৭ কোটি ও এক লাখ ২৫ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে এক লাখ ৫৯ হাজার ৮০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছরের জুলাইয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল এক লাখ ২২ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। জানুয়ারিতে লেনদেন হয়েছিল এক লাখ ৭১ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। এরপর থেকেই ক্রমাগতভাবে বাড়ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ। গত বছরের ডিসেম্বরে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। আগের মাস নভেম্বরে এক লাখ ৫৬ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। তার আগের তিন মাস আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ধারাবাহিকভাবে লেনদেনের পরিমাণ বাড়ে। আগস্ট থেকে যথাক্রমে লেনদেন হয়েছিল এক লাখ ৩৭ হাজার ৯২০ কোটি, এক লাখ ৪৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকা এবং এক লাখ ৫৪ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও কেনাকাটার বিল পরিশোধ, বেতন-ভাতা বিতরণ, বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোসহ (রেমিট্যান্স) বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে। সে কারণেই দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মাধ্যমটি। দেশে বর্তমানে বিকাশ, রকেট, নগদসহ ১৩টি এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আছে। গ্রহীতার সংখ্যা ২৪ কোটি ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইলে আর্থিক লেনদেনের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে এমএফএসে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ৬৩ জন। তার আগের মাস জুলাইতে ছিল ১৪ কোটি ৫৮ লাখ ২৫ হাজার ৫৬ জন। ২০২৫ সালের জুন মাসে এমএফএসে গ্রাহক সংখ্যা ১৪ কোটি ৫৬ লাখ ৪১ হাজার ৪৮৮ জন। তার আগের মাস মে-তে ১৪ কোটি ৪৯ লাখ ৯৮ হাজার ৫৯০ জন। এপ্রিলে ছিল ১৪ কোটি ৪১ লাখ ৭৪ হাজার ১১৫ জন ও মার্চে ছিল ১৪ কোটি ৩৬ লাখ ২৭ হাজার ২৮ জন। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারি শেষে দেশে এমএফএস গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ২৪ কোটি ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৪। আগের মাস জানুয়ারি শেষে এমএফএস সংখ্যা ছিল ২৩ কোটি ৯৩ লাখ ২ হাজার ৯৯১। ডিসেম্বরে ছিল ২৩ কোটি ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার ১৫৩। নভেম্বরে ছিল ২৩ কোটি ৭৩ লাখ ১২ হাজার ৫১৫।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ হিসাবে দেশে মোট জনসংখ্যা এখন ১৭ কোটি ৩৫ লাখ। গত ছয় বছরে দেশে এমএফএস গ্রাহকের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এমএফএস গ্রাহক ছিল ৬ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার ৪৬৮। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহক সংখ্যা ছিল ২২ কোটি ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬২৫ জন। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত এক বছরেই প্রায় দুই কোটি এমএফএস গ্রাহক বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় বছরে এমএফএসে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৪১৫ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে ব্যক্তি পর্যায়ের লেনদেন। এরপরে এগিয়ে রয়েছে বিভিন্ন মার্চেন্ট পেমেন্ট, বেতন পরিশোধ, পরিষেবা বিল, সরকারি ভাতা, টকটাইম ও প্রবাসীয় আয় সংক্রান্ত লেনদেন।
হাতের মোবাইলটিই এখন একটি ব্যাংক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যোগাযোগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আর্থিক লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে মোবাইল ফোন। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো এমএফএস মাধ্যমে প্রতিদিন এখন হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে।
এসব লেনদেনে অনেক সময় কারও সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে না। কারণ গ্রাহক নিজেই নিজের হিসাবে টাকা জমা করে অন্যকে পাঠানোর পাশাপাশি কেনাকাটাও করতে পারেন। যেমনÑ মোবাইল ফোনে রিচার্জ, বিভিন্ন কেনাকাটা, হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া ও পরিষেবার বিল পরিশোধ, টিকিট ক্রয় ইত্যাদি। পাশাপাশি এখন অর্থ স্থানান্তর, প্রবাসী আয় গ্রহণ, সরকারি ভাতা ও বৃত্তি বিতরণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেতন-বোনাস প্রদান এবং ব্যবসায়িক লেনদেনের বড় মাধ্যম হয়ে উঠছে এসব সেবা।
গবেষণা ও নীতিসহায়ক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গ্রাহকরা ঘরে বসেই মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খুলে লেনদেন করতে পারছেন। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল পরিশোধ, কেনাকাটার বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ, বেতন-ভাতা প্রদান, সরকারি ভাতা গ্রহণ, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) গ্রহণসহ নানাবিধ সুবিধা মোবাইল ব্যাংকিংকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে। বর্তমানে বিকাশ, রকেট, ইউক্যাশ, মাই ক্যাশসহ ১৩টি প্রতিষ্ঠান এই সেবা দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এমএফএস ব্যবস্থার মাধ্যমে পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা হচ্ছে। এ ছাড়া গাড়িচালক, নিরাপত্তাকর্মী ও গৃহপরিচারকদের বেতনও এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। যার ফলে দিন দিন নগদ টাকার লেনদেন কমে আসছে। এ প্রবণতা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।’