সাক্ষাৎকার
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:২০ এএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ০০:০১ এএম
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংকাস্যুরেন্স অত্যন্ত সফল। ব্যাংকের ওপর গ্রাহকের আস্থা কাজে লাগিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করতে চাইছে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) যৌথ উদ্যোগে এ কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্যাংকাস্যুরেন্সের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন চার্টার্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত সিইও এবং এএমডি মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ
প্রশ্ন : ব্যাংকাস্যুরেন্সের শুরুটা কীভাবে হলো?
উত্তর : ব্যাংকাস্যুরেন্সের যাত্রাটা শুরু হয়েছে অল্প কিছু দিন হলো। ব্যাংকাররা যে ইনস্যুরেন্স বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকবে- এটা বুঝতে তাদের একটু সময় লেগেছে। এখন অনেক ব্যাংকই এগিয়ে এসেছে, বিশেষ করে যাদের এনপিএল একটু ভালো। বেশকিছু ব্যাংক- বিশেষ করে সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, তারা খুব ভালোভাবেই সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায় অগ্রগতি ঘটিয়েছে। তারা প্রায় হাজারের ওপরে পলিসি বিক্রি করেছে। তারা বেশ কিছু ক্ষেত্রে মাইলফলক অর্জন করার চেষ্টা করছে। ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ইনস্যুরেন্স বিক্রি উন্নত বিশ্বের বেসিক কাজ। তবে জায়গাটা তৈরি করতে আমাদের একটু সময় লেগেছে। কিন্তু আমরা আশাবাদী যে, অল্প সময়ে দেশের সব ব্যাংকই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি সাপেক্ষে এ ব্যবসার কার্যক্রমের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়াবে।
প্রশ্ন : ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে সেবা শুরুর বিষয়ে কি আস্থার দিকটা গুরুত্ব পেয়েছে?
উত্তর : আস্থার জায়গাটা বড় লেভেলে পৌঁছার কারণে নিজের প্রয়োজনে মানুষ ব্যাংকে যায়। এখন এখানে আমরা দুটোর মধ্যে সমন্বয় করছি। সরকার ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু করেছে কারণ সরকার চায় দুটোতেই গ্রাহকের নিজেকেই আসতে হবে। কারণ মানুষ যখন গিয়ে ডোর টু ডোর মার্কেটিং করে, তখন সেখানে ভালো দিক যেমন থাকে, তেমনি খারাপ কিছুরও আশঙ্কা থাকে। কিন্তু যেখানে গ্রাহক নিজে এসে বিস্তারিত জানবে, সেখানে অথেনটিসিটিও চলে আসে। গ্রাহক সবকিছু নিজে দেখলেন, নিজের অ্যাকাউন্টটা নিজে দেখে শুনে বুঝে করলেন এবং সব সময় নিজের জামানত বা ডিপোজিটটা নিজে নিশ্চিত করলেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ব্যাংকের মাধ্যমে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম সংগ্রহ করবে। ব্যাংকের কাস্টমারই ইনস্যুরেন্স কিনবে। দেখা গেল, একটা ব্যাংকে যদি ৫০ হাজার কাস্টমার থাকে, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ব্যাংকারদের যদি কনভিন্স করতে পারে, তাহলে ২-৩ বছরের মধ্যে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো ওই ৫০ হাজার গ্রাহককে কিন্তু এডাপ্ট করে নিতে পারে। তাতে লাভ হলো, ব্যাংক ভালো একটা চার্জ পাবে। আর ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ভালো একটা মার্কেট পাবে।
প্রশ্ন : ব্যাংকাস্যুরেন্স বাস্তবায়নে প্রধান প্রতিবন্ধকতা কী?
উত্তর : প্রতিবন্ধকতা বলতে রেগুলেটরি অ্যাপ্রুভাল প্রসেস- যেখানে কিছু গাইডলাইন দেওয়া আছে। যদিও আমি এটাকে প্রতিবন্ধকতা বলব না, আমি বলব উত্তরণের উপায়। কেন উত্তরণ বলছি? কারণ যে ব্যাংক ভালো সার্ভিস দিচ্ছে এবং যেটির আর্থিক স্বচ্ছতা আছে, সেই ব্যাংককেই বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমতি দিচ্ছে। ঠিক তেমনি আইডিআরএ সার্ভিসের মানদণ্ডে যে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো ভালো, সেগুলোকে ব্যাংকাস্যুরেন্সের অনুমতি দিচ্ছে। এখন দুটো সাইটেই যেন এই মানদণ্ডের ব্যাপারটা একটু বিবেচনা করা হয়। আপনি জানেন, বাংলাদেশের আর্থিক খাতে অতীতে বিভিন্ন সময় বড় বড় ঝড় বয়ে গেছে। সেই জায়গা থেকে- যেমন, ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাংকেও একটা আস্থার সংকট হয়েছে। সেটা সাধারণ মানুষ প্রকাশ করছে না। ইনস্যুরেন্সেরটা প্রকাশ হয়- ব্যাংকেরটা হয় না। ব্যাংক যখন গ্রাহককে টাকা দিতে পারছে না, তখন সেগুলোকে মার্জার করা হচ্ছে। কিন্তু এত বছর পরও কোনো ইনস্যুরেন্সকে এভাবে মার্জার করতে হয়নি। ইনস্যুরেন্স ও ব্যাংক যদি সমন্বয় করা যেত, তাহলে মার্কেটটা অনেক বড় জায়গায় গিয়ে দাঁড়াত। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোতে ক্রাইটেরিয়া দিয়েছে, যে এনপিএল মিনিমান বেঞ্চমার্ক লেভেলে থাকবে। আইডিআরএ থেকেও কিন্তু আমাদের একটা অনুমতি নিতে হয়। অনুমতির জায়গায়টা যদি যথাযথ বিবেচনায় আনা যায়, তা হলে সেটা থেকে ভালো একটা রেজাল্ট পাওয়া যাবে।
প্রশ্ন : আগামী ১০ বছরে ব্যাংকাস্যুরেন্সকে কোথায় দেখতে চান?
উত্তর : ভারত বা ইউরোপে আজ থেকে ১০ বছর আগে রিটেইল ব্যবসা মানে ইনডিভিজ্যুয়াল লাইভ- ডোর টু ডোর মার্কেটিং ব্যবসা ছিল ৮০ শতাংশ। ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবসা ছিল মাত্র ২০ শতাংশ। বর্তমানে এই রেশিও উল্টে গেছে। ব্যাংক করছে ৮০ শতাংশ ব্যবসা আর রিটেইল মার্কেট সংকুচিত হয়ে মাত্র ২০ শতাংশে নেমে গেছে। আমাদের দেশেও যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায় এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায়, আমাদের কার্যক্রমে যদি আস্থার প্রতিফলন ঘটানো যায় তাহলে নিশ্চয়ই গ্রাহকরা আকৃষ্ট হবেন। এজেন্সি বিজনেস মডেল যেটা আমরা ফলো করছি, সেখান থেকে বেরিয়ে যদি ব্যাংকিং চ্যানেলে চলে আসি, তাতে স্বচ্ছতা যেমন নিশ্চিত হবে, জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে। টাকা পেতে হয়রানির শিকার হওয়া, সেই সুযোগ কিন্তু থাকবে না। আমরা অন্তত ৭০-৮০ শতাংশ ব্যাংকিং চ্যানেলে যেতে চাই।
প্রশ্ন : এ খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি আনতে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?
উত্তর : প্রথমত, হচ্ছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। অতীতে ইনস্যুরেন্স কোম্পানির অনেক ইতিবাচক দিক ছিল। মাঝখানে ৫-৬টা কোম্পানির কিছু অনিয়মের কারণে আমরা পুরো সেক্টরই এখন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছি। এর মধ্যেও অনেক কোম্পানি তাদের ম্যাচিউরিটি বা কাস্টমার সার্ভিস প্রতিনিয়ত নিশ্চিত করছে। কিন্তু সেটা প্রচার পাচ্ছে না বলে সংকটটা রয়ে গেছে। তবে আমরা ধীরে ধীরে উত্তরণ ঘটাচ্ছি। টেকনোলজিকে যতটা নিশ্চিত করা যাবে, যে কোম্পানি যত টেকনোলজিভিত্তিক হবে এবং কাস্টমারদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, তারা তত ভালো করতে থাকবে- অনেক ভালো করবে।