প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:০১ এএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ০০:০২ এএম
ব্যাংকাস্যুরেন্সে বীমা পণ্য বিক্রির মাধ্যমে সম্পৃক্ত ব্যাংক বীমা কোম্পানির কাছ থেকে নির্ধারিত হারে কমিশন পেয়ে থাকে। ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবসার যাবতীয় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় এ সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে উভয় পক্ষই লাভবান হচ্ছে। ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এ নীতিমালা ঘোষণা করে। নীতিমালা অনুসারে ব্যাংক কোম্পানি আইন মেনে ব্যাংকগুলো নতুন বীমা পণ্য বিক্রি শুরু করতে পারবে। প্রসঙ্গত, ব্যাংকাস্যুরেন্স দেশের আর্থিক খাতের জন্য নতুন ধারণা। এ বিষয়ে আগে কোনো নীতিমালা ছিল না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, এ নীতিমালার মাধ্যমে তফসিলি ব্যাংক এবং বীমা কোম্পানির পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই পক্ষেরই আয় বাড়বে। ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর দেশে চালু হয় ‘ব্যাংকাস্যুরেন্স’। ফলে বীমা পণ্য বিপণন ও বিক্রি করতে পারবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। মূলত বীমা কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে তারা।
দেশে কার্যরত সব তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু করা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৭(১)(ল) ধারায় ক্ষমতাবলে সরকারের অনুমোদনে বীমা কোম্পানির করপোরেট এজেন্ট হিসেবে পণ্য বিপণন ও বিক্রি করতে পারবে তারা। ইতোমধ্যে এ নীতিমালা কার্যকর হয়েছে।
‘ব্যাংকাস্যুরেন্স’ ফরাসি শব্দ। ১৯৮০ সালে ফ্রান্স ও স্পেনে প্রথম এটি চালু হয়। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে ব্যাংকের মাধ্যমে জীবন বীমা পলিসি বিক্রি হয়। এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও তা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রায় তিন যুগ আগে এটি প্রবর্তিত হয়েছে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাতে যা সফল হয়েছে।
কোম্পানিতে যেতে হবে না গ্রাহকদের
অনুমোদিত নীতিমালা অনুযায়ী দেশের ব্যাংকগুলোর শাখার মাধ্যমে ব্যাংকাস্যুরেন্স বাস্তবায়িত হবে। বীমা কোম্পানির করপোরেট এজেন্ট বা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে তারা। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ আছে, বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা তুলনামূলক কম। তাই ব্যাংকাস্যুরেন্স হতে পারে তাদের ভরসার জায়গা।
এর ফলে বীমা পণ্যের জন্য গ্রাহকদের কোম্পানিতে যেতে হবে না। ব্যাংকের শাখায় গেলেই চলবে। এর মানে গ্রাহকের কাছে ব্যাংকিং পণ্যের পাশাপাশি বীমা পণ্যও বিক্রি করবে তারা। পণ্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- পেনশন, স্বাস্থ্য, দুর্ঘটনা, দেনমোহর, শিক্ষা, ওমরাহ, হজ ইত্যাদি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে থাকা ব্যাংক ব্যাংকাস্যুরেন্সের এজেন্ট হতে পারবে। এজন্য বীমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। কিন্তু কোনো ব্যাংকাস্যুরেন্স এজেন্ট তিনটির বেশি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে না। এক্ষেত্রে কোম্পানিকে আইডিআরএ এবং ব্যাংকাস্যুরেন্স এজেন্টকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে।
ব্যাংকাস্যুরেন্সে বীমা পণ্য বিক্রির বিপরীতে ব্যাংক নির্ধারিত হারে বীমা কোম্পানির কাছ থেকে কমিশন পাবে। সেবাটি তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাংকাস্যুরেন্স নামে আলাদা শাখা খোলা হয়েছে। আইডিআরএ নিজেও বীমা-সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা ইউনিট চালু করেছে। বীমা কোম্পানিগুলো কমিশন ভাগাভাগি করে ব্যাংকের মাধ্যমে নিজেদের পণ্যেও প্রসার ঘটাতে পারবে। এতে উভয় পক্ষেরই লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে।
ব্যাংকাস্যুরেন্সের ক্ষেত্রেও বীমা দাবি বা অভিযোগ নিষ্পত্তি হবে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী। ব্যাংক কিন্তু দাবি পরিশোধের নিশ্চয়তা দেবে না। ব্যাংক থেকে পলিসি কিনতে গেলে ব্যাংকে হিসাব থাকতে হবে। বীমা কোম্পানির মাধ্যমে একই পলিসি কিনতে গেলে ব্যাংক হিসাব শুরুতে না থাকলেও চলে, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাংক হিসাব খোলা বাধ্যতামূলক।
আইডিআরএতে দিতে হবে সাত ধরনের তথ্য
কোনো ব্যাংক যদি ব্যাংকাস্যুরেন্স সেবা চালু করতে চায়, তাহলে প্রথমেই সেটির পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদনের কপিসহ আবেদন করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে। আবেদনের সঙ্গে ব্যাংকের দুই বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন, ঋণমান, খেলাপি ঋণের হারসহ ২০ ধরনের তথ্য দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পূর্বানুমতি নেওয়ার পর আইডিআরএ থেকে করপোরেট এজেন্ট হিসেবে লাইসেন্স নিতে হবে। এর পর সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে হবে।
অন্যদিকে বীমা কোম্পানিকে ব্যাংকাস্যুরেন্সের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তির অনুমোদন পেতে আইডিআরএতে সাত ধরনের তথ্য দিতে হবে। করপোরেট এজেন্ট (ব্যাংকাস্যুরেন্স) নির্দেশিকা, ২০২৩ অনুযায়ী ব্যাংকাস্যুরেন্স চুক্তি সম্পাদনের অনুমোদনের আবেদনে প্রয়োজনীয় সব তথ্য দাখিল করতে হবে। তথ্যগুলো হলোÑ বীমাদাবি নিষ্পত্তির হার, অনুমোদিত ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও প্রকৃত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের পরিমাণ, মোট সম্পদের বিনিয়োগ শতাংশ ও তারল্যে রূপান্তর শতাংশ সংক্রান্ত তথ্য, কোম্পানির বিনিয়োগ রিটার্নের হার, জীবন তহবিলের পরিমাণ, নবায়ন হার এবং ব্যাংকাস্যুরেন্স চুক্তির খসড়া।
ব্যাংকাস্যুরেন্স হচ্ছে চুক্তি, কোনো বীমা পণ্য নয়। এ চুক্তির মাধ্যমে বীমা কোম্পানির পক্ষে তাদের পণ্য বা পলিসি বিক্রি বা বাজারজাত করে থাকে ব্যাংক। অর্থাৎ ব্যাংক এখানে কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। গ্রাহকের বীমাদাবি পরিশোধে বীমা কোম্পানির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
দাবির বেলায় বীমা গ্রাহক বা তার নমিনি বীমা কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ অথবা ব্যাংকের মাধ্যমেও যোগাযোগ করতে পারবেন। দাবি গ্রহণযোগ্য হলে বীমা কোম্পানি সরাসরি বীমা গ্রাহক বা তার নমিনিকে চেক দেবে এবং ব্যাংককে জানিয়ে দেবে। তবে দাবির টাকা পরিশোধের ব্যাপারেও আইনগতভাবে ব্যাংকের কোনো দায়দায়িত্ব থাকবে না।
ব্যাংকাস্যুরেন্স চালুর ক্ষেত্রে ব্যাংকের আর্থিক সূচকের মানদণ্ড ঠিক করে নীতিমালা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বলা হয়, ব্যাংক বীমাকারীর বীমা-সংক্রান্ত কোনো ঝুঁকি গ্রহণ করবে না বা বীমাকারী হিসেবে কাজ করবে না মর্মে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে।
করপোরেট এজেন্ট হিসেবে বীমা পণ্য ও সেবা বিক্রি করতে চাইলে কোনো ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি নিতে হবে। অনুমোদন পাওয়ার পর ব্যাংককে স্বতন্ত্র ব্যাংকাস্যুরেন্স ইউনিট বা উইং প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংক কোনো গ্রাহককে বীমা পণ্য গ্রহণে বাধ্য করতে পারবে না, কোনো গ্রাহককে বীমা পণ্য ক্রয়ে উৎসাহিত করার জন্য বীমা কোম্পানি ঘোষিত মূল্য ছাড়া অন্য কোনো প্রণোদনাও দিতে পারবে না। ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু করতে আগ্রহী ব্যাংককে পরপর তিন বছর মুনাফা অর্জন করতে হবে।
একটি ব্যাংক একই সঙ্গে সর্বোচ্চ তিনটি জীবন বীমা ও তিনটি সাধারণ বীমার পণ্য-সেবা বিক্রি করতে পারবে। যেসব ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের কম, তারাই শুধু এ সেবায় যুক্ত হতে পারবে। সেক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধনের বিপরীতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের (সিআরএআর) অনুপাত হতে হবে সাড়ে ১২ শতাংশ। ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ক্রেডিট রেটিং বা ঋণমানে গ্রেড-২-এর নিচে থাকা ব্যাংক বীমা ব্যবসায় যুক্ত হতে পারবে না। আগ্রহী ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিংও ন্যূনতম ২ থাকতে হবে। খেলাপি ঋণের বিষয়ে বলা হয়েছে, নিট খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।