ব্যাংকাস্যুরেন্স
আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৫২ এএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ০০:০৯ এএম
দেশে সাড়া ফেলেছে ব্যাংকাস্যুরেন্স সেবা। এখন ব্যাংকের মাধ্যমেই গ্রাহকরা নিতে পারছেন বীমা সেবা। এতে ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির মধ্যে নতুন অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) যৌথ উদ্যোগে ২০২২ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘ব্যাংকাস্যুরেন্স নীতিমালা’। সেই নীতিমালার আওতায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কয়েকটি ব্যাংক পরীক্ষামূলকভাবে সেবা চালু করে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে গ্রাহক সুবিধা যেমন বেড়েছে, তেমনি বীমা খাতের সম্প্রসারণও হয়েছে। ব্যাংকাস্যুরেন্স সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকগুলোর আয়ের নতুন উৎস তৈরি হবে, পাশাপাশি বীমা খাতেও আসবে গতি। তবে এক্ষেত্রে কর্মীদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী তদারকি প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা।
ব্যাংকাস্যুরেন্স সেবা দিচ্ছে যেসব ব্যাংক
ইতোমধ্যে ১২টি ব্যাংক ব্যাংকাস্যুরেন্স সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলো হলো- সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল), ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি), প্রাইম ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) এবং বিদেশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক।
যেসব ব্যাংক ও কোম্পানির মধ্যে চুক্তি হয়েছে
এসব ব্যাংক ইতোমধ্যে কয়েকটি সাধারণ (নন-লাইফ) ও জীবন বীমা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সই করেছে। যেসব বীমা কোম্পানির সঙ্গে ব্যাংকগুলোর চুক্তি হয়েছে সেগুলো হলোÑ গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স, রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স, প্রগতি লাইফ ইনস্যুরেন্স, গার্ডিয়ান লাইফ ও মেটলাইফ বাংলাদেশ।
ব্যাংকাস্যুরেন্স সেবা দিতে সিটি ব্যাংক চুক্তি করেছে পিএলসি গার্ডিয়ান লাইফ ইনস্যুরেন্স, রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স, পাইওনিয়ার ইনস্যুরেন্স ও সিটি জেনারেল ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সঙ্গে। ইবিএল চুক্তি করেছে মেটলাইফ ও গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে। এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক মেটলাইফের সঙ্গে এবং ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি মেটলাইফ ও গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স এবং পাইওনিয়ার ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে।
এ ছাড়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসি গার্ডিয়ান লাইফ ও প্রগতি লাইফ ইনস্যুরেন্সের সঙ্গে; এমটিবি গার্ডিয়ান লাইফ, প্রগতি লাইফ ও ইগ্রন ডেল্টা ইনস্যুরেন্সের সঙ্গে; প্রাইম ব্যাংক পিএলসি ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্সের সঙ্গে; যমুনা ব্যাংক পিএলসি ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সঙ্গে; পূবালী ব্যাংক ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্সের সঙ্গে, প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি এলআইসি বাংলাদেশের সঙ্গে, মিডল্যান্ড ব্যাংক পিএলসি এলআইসি, সন্ধানী লাইফ, আকিজ তাকাফুল লাইফ ও প্রগতি ইনস্যুরেন্সের সঙ্গে এবং ইউসিবি ব্যাংক পিএলসি জীবন বীমা করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করেছে।
গ্রাহক ভিত্তি বাড়ছে, আস্থা ফিরছে বীমা খাতে
আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, দেশে বীমা খাতে গ্রাহকের আগ্রহ এখনও খুবই কম। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ। ব্যাংকাস্যুরেন্স চালুর ফলে গ্রাহক ভিত্তি বাড়ছে। তাতে বীমা খাতে আস্থা ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যাংকারদের মতে, বীমা খাতকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যাংকাস্যুরেন্স কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে গ্রাহকের আস্থা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এটি আর্থিক খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। ব্যাংকাস্যুরেন্স নামের এই বীমা পণ্য বিক্রির বিপরীতে ব্যাংক নির্ধারিত হারে বীমা কোম্পানির কাছ থেকে কমিশন পাবে। সেবাটি তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাংকাস্যুরেন্স নামে আলাদা শাখা খোলা হয়েছে। আইডিআরএ নিজেও বীমা-সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা ইউনিট চালু করেছে। বীমা কোম্পানিগুলো কমিশন ভাগাভাগি করে ব্যাংকের মাধ্যমে নিজেদের পণ্যের প্রসার ঘটাতে পারবে। এতে উভয় পক্ষেরই লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে।
ব্যাংকের ভূমিকা ও দায়দায়িত্ব
প্রসঙ্গত ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে বীমা কোম্পানির পক্ষে তাদের পণ্য বা পলিসি বিক্রি বা বাজারজাত করে থাকে ব্যাংক। অর্থাৎ ব্যাংক এখানে কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। গ্রাহকের বীমাদাবি পরিশোধে বীমা কোম্পানির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
দাবির বেলায় বীমা গ্রাহক বা তার নমিনি বীমা কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ অথবা ব্যাংকের মাধ্যমেও যোগাযোগ করতে পারবেন। দাবি গ্রহণযোগ্য হলে বীমা কোম্পানি সরাসরি বীমা গ্রাহক বা তার নমিনিকে চেক দেবে এবং ব্যাংককে জানিয়ে দেবে। তবে দাবির টাকা পরিশোধের ব্যাপারে ও আইনগতভাবে ব্যাংকের কোনো দায়দায়িত্ব থাকবে না।
ব্যাংকাস্যুরেন্স চালুর ক্ষেত্রে ব্যাংকের আর্থিক সূচকের মানদণ্ড ঠিক করে দিয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নীতিমালা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোনো বীমাকারীর বীমা-সংক্রান্ত কোনো ঝুঁকি গ্রহণ করবে না বা বীমাকারী হিসেবে কাজ করবে না মর্মে ব্যাংককে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে।
এ ছাড়া ব্যাংকাস্যুরেন্স প্রবর্তন করতে ইচ্ছুক ব্যাংকটির পরপর তিন বছর ধারাবাহিকভাবে নিট মুনাফা ধনাত্মক বা ইতিবাচক থাকতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে সংরক্ষিত মূলধন অনুপাত থাকতে হবে কমপক্ষে সাড়ে ১২ শতাংশ। সিনিয়র ব্যাংকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, এই মুহূর্তে নীতিমালার সব শর্ত পূরণ করতে পারেÑ এমন ব্যাংকের সংখ্যা হবে সর্বোচ্চ ১৫টি। অর্থাৎ সব ব্যাংক ব্যাংকাস্যুরেন্স প্রবর্তনের সুযোগ পাচ্ছে না।
শীর্ষস্থানীয় একাধিক বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেছেন, ব্যাংকাস্যুরেন্স প্রবর্তনে আগ্রহী ব্যাংকের এ-সংক্রান্ত দক্ষ জনবল ও একটি স্বতন্ত্র উইং দরকার হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত ব্যাংকাস্যুরেন্স সম্পর্কিত কর্মপরিকল্পনাও থাকতে হবে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে আইডিআরএ থেকে লাইসেন্স অর্জন করতে হবে। সবকিছু চূড়ান্ত হলে একটি ব্যাংক সর্বোচ্চ তিনটি লাইফ ও তিনটি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির সঙ্গে পলিসি বিক্রয়ের চুক্তি করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের অভিমত
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ব্যাংকাস্যুরেন্স পুরোপুরি কার্যকর হলে ব্যাংকে তারল্য বাড়বে। বীমা কোম্পানির ব্যবসার ব্যয় সাশ্রয় হবে। বীমা খাতে গ্রাহকের আস্থা তলানিতে। তাই ব্যাংকাস্যুরেন্স খুবই ইতিবাচক বলে আমার মনে হয়।’
এ প্রসঙ্গে চার্টার্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ বলেন, ‘ব্যাংকাস্যুরেন্সের যাত্রাটা শুরু হয়েছে অল্প কিছুদিন হলো। ব্যাংকাররা যে ইনস্যুরেন্স বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকবেÑ এটা তাদের প্রথমে বুঝতে একটু সময় লেগেছে। এখন অনেক ব্যাংকই এগিয়ে এসেছে, বিশেষ করে যাদের এনপিএল একটু ভালো।’
বীমা বিশেষজ্ঞ ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে নানা বাধার জন্য ব্যাংকাস্যুরেন্স খুব একটা সফল হতে পারেনি। তবে সরকার এটাকে গুরুত্ব দিলে খুব ভালো করবে বলে বিশ্বাস করি।’ তিনি বলেন, ‘দেশের বীমা খাতে জনগণকে উন্নত সেবা দিতে ব্যাংকাস্যুরেন্স প্রবর্তন করা হয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় ব্যাংকের শাখায় শাখায় বীমা কোম্পানির পলিসি বিক্রি হবে। বীমা গ্রাহককে পলিসি বিক্রয় থেকে শুরু করে কিস্তি ও বীমাদাবি পরিশোধসহ সব সেবা দেবেন ব্যাংক কর্মকর্তা।’