ব্লু নেটওয়ার্ক প্রোগ্রাম
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ১০:১৬ এএম
গ্রাফিক্স, প্রবা
ঢাকার মৃতপ্রায় নদী ও খালগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং নগরজীবনে পানি ও পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ৬০ কোটি ডলার মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে বিশ্বব্যাংক। সরকারের পরিকল্পিত ব্লু নেটওয়ার্ক প্রোগ্রামের অধীনে এই অর্থ ব্যয় হবে ঢাকাসহ আশপাশের নদী, খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার পুনর্গঠনে।
এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ নগর-পরিবেশ পুনর্গঠন কর্মসূচি, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৫০ কোটি ডলার। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা, নদীদূষণ ও পানি সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার টেকসই সমাধান মিলবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রকল্পের প্রথম ধাপের ব্যয় ধরা হয়েছে ১০০ কোটি ডলার, যার প্রায় ৬০ শতাংশ দেবে বিশ্বব্যাংক। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে এই ধাপ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো কর্মসূচি ২০৪০ সাল পর্যন্ত চলবে, যা ঢাকাকে একটি টেকসই ও বাসযোগ্য জলনগরে রূপান্তরের রূপরেখা তৈরি করবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ব্লু নেটওয়ার্ক প্রোগ্রাম শুধু নদী পুনরুদ্ধার নয়; বরং বন্যা নিয়ন্ত্রণ, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিরাপত্তার একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করবে। বিশ্বব্যাংক এরই মধ্যে প্রকল্পের ধারণাপত্র এবং পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থা মূল্যায়ন প্রণয়ন করেছে।
এই উদ্যোগের অধীনে রাজধানীর চারপাশ ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে যুক্ত ৫৭টি খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব খালকে পুনরুদ্ধার করে এমনভাবে সাজানো হবে যাতে বৃষ্টির পানি সহজে নিষ্কাশন হয় এবং নদী ও খাল শহরের পরিবেশের অংশ হিসেবে টিকে থাকে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, প্রকল্পটির আওতায় নদী ও খালের প্রায় ৪২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ড্রেনেজ চ্যানেল পুনর্গঠন, নদীতীর সংরক্ষণ, বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন, জলাধার সংস্কার এবং জলপথভিত্তিক পরিবহন চালুর মতো একাধিক কার্যক্রম নেওয়া হবে। এতে জলাবদ্ধতা কমবে, নদীর প্রবাহ বাড়বে এবং ঢাকার সামগ্রিক বায়ু ও পানির মান উন্নত হবে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের পাশাপাশি ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স (ডিওয়াটার) প্রোগ্রাম’ নামের একটি সহায়ক প্রকল্পও প্রস্তাব করেছে সরকার। এতে আরও ৫৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ ও ৫ কোটি ডলার কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব আছে, যা পানীয়জল সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ঢাকায় বর্তমানে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানির সরবরাহ ৭০ শতাংশের মধ্যে সীমিত, আর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় আছে মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা। আশপাশের শহরগুলোতে এই হার আরও কম। অপরিশোধিত বর্জ্য ও শিল্পকারখানার তরল বর্জ্যের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য নদীতে গিয়ে মিশছে, যা শহরের প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত করছে এবং পানিদূষণ বাড়াচ্ছে।
ব্লু নেটওয়ার্ক প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের বাস্তবায়নে যুক্ত থাকবে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসা।
অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গত বছর এই উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকাকে যদি টেকসই রাখতে হয়, তবে তার নদীগুলোর প্রাণ ফেরাতেই হবে। ব্লু নেটওয়ার্কের লক্ষ্য সেই নদীর সঙ্গে নাগরিক জীবনের পুনঃসংযোগ।’
রাজউকের বিস্তারিত এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা (ড্যাপ ২০২২-২০৩৫)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই প্রকল্পে ঢাকার জলপথ, খাল ও জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ পুনঃস্থাপন করা হবে। এতে শুধু নদী নয়, শহরের জলাধার ও সংযোগ খালগুলোকেও পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকার নদীগুলো আবারও হবে শহরের জীবনরেখা। দূষণ ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি নদীপাড়ে তৈরি হবে হাঁটার পথ, বিনোদন এলাকা ও সবুজ বেষ্টনী; যা নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই উদ্যোগ শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ পানি ও স্যানিটেশন খাতে উন্নয়ন মানে স্বাস্থ্য ব্যয় কমে আসা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি।
বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, ব্লু নেটওয়ার্ক প্রোগ্রাম যদি সফলভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে ঢাকা হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম শহর; যেখানে নদী ও নগর একসঙ্গে টেকসই উন্নয়নের প্রতীকে পরিণত হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দখলদার উচ্ছেদ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ। নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা হাজারো স্থাপনা ভাঙা ছাড়া নদী বাঁচানো সম্ভব নয়। তাছাড়া শিল্প-কারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে শক্ত আইন প্রয়োগ জরুরি।