চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৫ ২২:০৯ পিএম
স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ না করা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ধিত মাশুল স্থগিত করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, এই বর্ধিত মাশুল স্থগিত রেখে সকল স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে সবার সম্মতিতে যেই বর্ধিত মাশুল নির্ধারণ করা হবে, সেটিই কার্যকর করতে হবে। ব্যবসায়ীরা বলেন, মাশুল বাড়ানোর সময় আমরা বলছি আমাদের থেকে সিঙ্গাপুর বন্দরের মাশুল বেশি, সাংহাই বন্দরের মাশুল বেশি। কিন্তু আমরা বন্দর অপারেট করবো ওইসব বন্দর থেকে ৫০ শতাংশ কম সক্ষমতা নিয়ে, সেটি হবে না।
রবিবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে রেডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউতে চট্টগ্রাম বন্দরে অস্বাভাবিক ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের সমন্বয় সভায় ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। চট্টগ্রামের সর্বস্তরের ব্যবসায়ীদের ব্যানারে আয়োজিত সমন্বয় সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী।
সভাপতির বক্তব্যে আমির হুমায়ুন চৌধুরী বলেন, ‘প্রত্যেক স্টেকহোল্ডারকে ডেকে আলাপ আলোচনা করে বর্ধিত মাশুল কার্যকর করা হয়। এটি না করা পর্যন্ত এই বর্ধিত মাশুল স্থগিত রাখতে হবে। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যেই রেট নির্ধারণ হবে, সেটিই কার্যকর করতে হবে। মাশুল বাড়লে পয়সাটা যাবে কার পকেট থেকে। পয়সাটা যাবে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। আমি ব্যবসা করলে আমার পকেট থেকে যাবে না। এই পয়সাটা যাবে অ্যান্ড ইউজার অর্থাৎ সবার শেষে যারা পণ্য ভোগ করবেন তাদের পকেট থেকে যাবে। ব্যবসায়ীরা হয়তো আপাতত সমস্যায় পড়বে। কিন্তু মাশুল বাড়লে চুড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ ভোক্তা। কারণ ব্যবসায়ীরা বর্ধিত খরচ সমন্বয় করেই পণ্যের দাম নির্ধারণ করবে। সাধারণ ভোক্তাদের কাছ থেকে ওই টাকাটা উঠিয়ে নিবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বন্দর হচ্ছে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। এরপরও তারা লাভ করছে। লাভ করুক সেটি নিয়ে আমাদের আপত্তি নেই। লাভের টাকা দিয়ে বন্দরের পরিধি বাড়াবে। কিন্তু এটি রাখতে হবে সহনীয় পর্যায়ে। অধিক লাভের জন্য অযৌক্তিভাবে মাশুল বাড়িয়ে দেয়া যাবে না। একটি লিমিট আয়ের মাধ্যমে তারা লাভ করবে সেটি নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তাই বলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর অজুহাত দিয়ে ৪১ শতাংশ মাশুল বাড়িয়ে দিবে কেন?’
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি এসএম আবু তৈয়ব’র সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সালাম। সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক, বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি সেলিম রহমান, মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহ সভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরী, শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন, বিজিপিএমইএ’র সহসভাপতি শহীদুল্লাহ চৌধুরী, বেপজিয়ার সিনিয়র সহ-সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভির, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সভাপতি এসএম সাইফুল আলম, বিজিএমইএ’র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী, বারভিডার সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী
সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন ‘আমি একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি চালায়। আমার কোম্পানিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর আছে। আমির হুমায়ুন চৌধুরী একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি চালায়, উনার প্রতিষ্ঠানেও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর আছে। আপনি পাবলিক লিমিটেড চালাতে ইন্ডিটেন্ডেন্ট ডিরেক্টর রাখবেন, আর বন্দর পরিচালনা করবেন সেখানে প্রাইভেট সেক্টর থেকে প্রতিনিধি রাখবেন না। সেটি হতে পারে না। আমরা সেটি চাই না।’
আমিরুল হক বলেন, ট্যারিফ বাড়ানোটা একটি ষড়যন্ত্র। আপনি চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ বাড়াচ্ছেন। কিন্তু মংলা বন্দরের ট্যারিফ বাড়ান নাই। পায়রা বন্দরের ট্যারিফ বাড়ান নাই। চট্টগ্রামের প্রতি এসব ষড়যন্ত্র দয়া করে করবেন না। নই। বন্দরকে বাঁচাতে হবে। বন্দরকে কস্ট বেইজড ট্যারিফ করতে হবে।
বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, আমরা মাশুল বাড়ানোর বিরুদ্ধে না। কিন্তু আমাদের কথা হচ্ছে কস্ট বেইজড হতে হবে। রেডিমেইড গার্মেন্টস ব্যবসায়ী হিসেবে আমি একবার আমদানি করি, আবার ফিনিশড প্রোডাক্ট রপ্তানি করি। আমরা দুই ধরনের ক্যালকুলেট করি। এর মধ্যে কস্ট কমপ্লায়েন্স ডকুমেন্টেশন যেখানে বন্দরের মাশুলসহ অন্যান্য খরচ হিসেব করা হয়। সেখানে আমাদের খরচ প্রতিযোগী দেশে ভিয়েতনাম, ভারত, মালয়েশিয়ার চেয়ে অনেক বেশি। এরপর বন্দরের মাশুল যদি বাড়ানো হয়, তাহলে সেটি আরও অনেক বেশি বেড়ে যাবে। তখন আমরা প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে পড়বো।
মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহ সভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরী বলেন, পোশাক রপ্তানিতে আমেরিকা ২০ শতাংশ শুল্ক বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে যদি আপনারা বন্দরের মাশুল ৪১ শতাংশ বাড়ান। তাহলে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে আমরা আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবো না। চট্টগ্রাম বন্দর জনগনের টাকায় তৈরি করা। জনগনের সেবার জন্যই এটি গড়ে তোলা। অধ্যাদেশে বলা আছে একটি উপদেষ্টা পরিষদ থাকবে। তারা পরামর্শ দিবে, আপনারা সেইভাবে চালাবেন। কিন্তু ২০২৩ সালের বন্দর আইনে উপদেষ্টা পরিষদ বাতিল করেছে।
তিনি আরও বলেন, ইআরডি থেকে যেই তথ্য পেয়েছি সেটি অনুযায়ী একটি কন্টেইনার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে যেতে লাগে ৪০০ ডলার। কিন্তু ভারত থেকে যেতে লাগে ২০০ ডলার, ভিয়েতনামেও একই রেশিও। এখন যদি আরও বাড়ে, তাহলে বাংলাদেশি পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। আর দাম বাড়লে বায়ার বাংলাদেশ থেকে কিনবে না। যেই দেশে কম পাবে সেখান থেকে কিনবে।
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, বন্দরের মাশুল বাড়ানো নিয়ে আমাদের ক্ষোভ আছে। বিভিন্ন সভা সেমিনারে আমরা বলেছিলাম। আমাদের সঙ্গে একটা সভা করেছিল, সেখানে আমরা বলেছি বন্দরের মাশুল যদি বাড়াতে হয়, তহলে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বাড়াতে। কারণ আপনারা যে মাশুল বাড়াবেন সেটি চুড়ান্তভাবে গিয়ে ভোক্তা এবং রপ্তানিকারকের ঘাড়ে গিয়ে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ বলে তারা সর্বশেষ ১৯৮৬ সালে মাশুল বাড়িয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন। বন্দরের মাশুল ধারাবাহিকভাবেই বাড়ছে। কারণ বন্দর কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ মাশুল নেয় ডলারে। ১৯৮৬ সালে ডলার ছিল ৩০ টাকা। এখন ডলারের দাম চারগুণ বেড়েছে। এই হিসেবে বন্দরের মাশুলও চারগুণ বেড়েছে।
বেপজিয়ার সিনিয়র সহ-সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভির বলেন, আমরা সাফার করছি বিভিন্ন কারণে। এখন অনেক সিদ্ধান্ত আসছে, এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সাথে কতটুকু আলাপ আলোচনা করা হচ্ছে আমার জানা নেই। সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে ব্যবসায়ীদের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, যেগুলো ব্যবসায়ীদের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই বাড়তি ব্যয় বহন করার মতো সক্ষমতা আছে কিনা, সেটি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে নিলে ভালো হয়।
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে আমরা এখন যেই অবস্থায় আছি। সেটি আসলে আমরা একটি ট্রানজিশনাল পিরিয়ড পার করছি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত নানা কারণে এখন চ্যালেঞ্জের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। এই সময় বন্দরের মাশুল বাড়ানো সিদ্ধান্ত আমরা উপযুক্ত মনে করছি না। বন্দরের মাশুল বাড়ানোর সময় আমরা সিঙ্গাপুর, সাংহাই বন্দরের সঙ্গে তুলনা করছি, কিন্তু ওইসব বন্দরের সক্ষমতার সঙ্গে আমাদের বন্দরের সক্ষমতা তুলনা করছি না।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সভাপতি এসএম সাইফুল আলম বলেন, আমরা বসে নেই। কাজ করছি। বিজিএমই, চেম্বারে যখন নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিল না তখন আমরা কাজ করেছি আপনাদের পক্ষে। ডুয়েল ডেলিভারির বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করছি চট্টগ্রাম চেম্বারে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আসবেন। চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী, ব্যবসায়ীদের সমস্যা নেই। সাড়ে পাঁচশ টন ডাল এনে বাজারে বিক্রি করতে পারেনি। ডিপোতে অনৈতিক চার্জ বাড়ানো হচ্ছে। বন্দর, বার্থ, শিপিং, ডিপোতে যেন চার্জ বাড়ানো না হয়। সবাই ঐক্যবদ্ধ হলে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারবে না।
এর আগে স্বাগত বক্তব্যে এশিয়ান গ্রুপের প্রধান এমএ সালাম বলেন, সংকট নিয়ে আজকের সভা। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম এক দিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। এটা প্রশংসার দাবি রাখে। বন্দর ব্যবসা করে না, সেবা দেয়। বন্দরের মাশুল এক মাসের জন্য পিছিয়েছে। ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে আমরা ভালো অবস্থানে নেই। আমরা চাই না বন্দর লস করুক। আমরা এটাও চাই না বন্দরের ট্যারিফ বাড়ানোর ফলে আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।