আমদানি-রপ্তানি
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১১:১১ এএম
বন্দরে কনটেইনার উঠা-নামা, পরিবহন, টাগ বোট, পাইলট চার্জ, জাহাজ ভেড়ানো, লিফট ও ক্রেন সার্ভিসসহ সব ক্ষেত্রেই মাশুল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আগামী ১৫ অক্টোবর এই বর্ধিত মাশুল কার্যকর হলে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে আগের তুলনায় শুধু বন্দরকেন্দ্রীক খরচ বাড়বে অন্তত ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ আগে বন্দরের বিভিন্ন ফি বাবদ ১০০ টাকা পরিশোধ করতে হলে এখন এই খাতে খরচ হবে ১৪১ টাকা।
বন্দরের এই মাশুল বৃদ্ধি দেশের আমদানি-রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, অল্প সময়ের ব্যবধানে এবার বন্দরের মাশুল, বেসরকারি অফডকগুলোর চার্জ, বার্থ অপারেটরদের চার্জ বেড়েছে। এতে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে খরচ বেড়ে একদিকে বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে। অন্যদিকে খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ারও আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
ইতোমধ্যে এই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। বন্দরের মাশুল বাড়ানোর নির্দেশনার পর সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি পণ্যে সারচার্জ বা বাড়তি মাশুল আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সভিত্তিক শিপিং কোম্পানি সিএমএ-সিজিএম। প্রতিষ্ঠানটির ঘোষণা অনুযায়ী, এই রুটে কন্টেইনারভেদে আমদানি রপ্তানি পণ্যে ৪৫ থেকে ৩০০ ডলার পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে সারচার্জ।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদ্য সাবেক সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অল্প সময়ের ব্যবধানে আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো স্টেকহোল্ডার এবার তাদের মাশুল বাড়িয়ে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সেই দেশে পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক বাড়িয়েছেন। এরপর বার্থ অপারেটররা তাদের ফি বাড়িয়ে দিয়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে অফডকগুলো তাদের মাশুল বাড়িয়ে দিয়েছেন। সর্বশেষ এখন বন্দর কর্তৃপক্ষ অনেক বছর পর ৪১ শতাংশ মাশুল বাড়িয়ে দিয়েছে। যেটি সামগ্রিকভাবে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কারণ এসব খরচ আমাদের (শিপিং লাইন) প্রিন্সিপাল অপারেটররা জাহাজ ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করবেন। এতে জাহাজ ভাড়া, কন্টেইনার ভাড়া বাড়বে। যে কারণে আমদানি রপ্তানিতে খরচ বেড়ে যাবে। পণ্য আমদানিতে খরচ বাড়লে দেশের বাজারে ওইসব জিনিসের দাম বেড়ে যাবে।’
পণ্য আমদানি রপ্তানিতে অন্যতম স্টেকহোল্ডার হলোÑ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো, বার্থ অপারেটর এবং শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশেন। আমদানির ক্ষেত্রে পণ্য ভর্তি কন্টেইনারগুলো বন্দরে রাখার পর ওখান থেকে আমদানিকারকরা খালাস নেন। অথবা সেখান থেকে বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোতে পাঠানোর পর ডিপোতে খালাস নেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে খালাস নিতে দেরি হলে আমদানি পণ্যভর্তি কন্টেইনারগুলো বন্দর অথবা অফডকে থাকে। ঠিক একইভাবে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে রপ্তানি পণ্যগুলো প্রথমে বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোগুলোতে পাঠানো হয়। এরপর কন্টেইনারে ভর্তি করার পর সেখানে থেকে জাহাজের শিডিউল অনুযায়ী কন্টেইনারগুলো বন্দরে পাঠানো হয়। এরপর সেখান থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ কন্টেইনারগুলো জাহাজে তুলে দেন।
সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি-রপ্তানির পণ্য পরিবহনের এই চেইনে খরচ ব্যাপক বেড়েছে। ১৫ অক্টোবর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ট্যারিফ বাবদ সব মিলিয়ে মাশুল বাড়বে ৪১ শতাংশ। এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে বেসরকারি অফডকের চার্জ বেড়েছে ৪৪ শতাংশ। তার আগে বার্থ অপারেটরদের চার্জ বাড়ানো হয়েছে ৩৫ শতাংশ। পণ্য রপ্তানিতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশের পণ্য আমদানিতে ২০ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ। বন্দরের মাশুল বৃদ্ধির কারণে এখন আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনে চার্জ বাড়ানো শুরু করেছে শিপিং লাইনগুলো। বন্দরের মাশুল বাড়ানোর নির্দেশনার পর ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি পণ্যে সারচার্জ বা বাড়তি মাশুল আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সভিত্তিক শিপিং কোম্পানি সিএমএ-সিজিএম। প্রতিষ্ঠানটির ঘোষণা অনুযায়ী, এই রুটে কন্টেইনারভেদে আমদানি রপ্তানি পণ্যে ৪৫ থেকে ৩০০ ডলার পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে সারচার্জ।
বন্দর এবং অফডকের চার্জ বৃদ্ধি দেশের আমদানি রপ্তানিকে পিছিয়ে দিবে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন শুল্ক আরোপের পর আমরা এমনিতে প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি। এর সঙ্গে গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে অফডকগুলো ৪৪ শতাংশ চার্জ বাড়িয়েছে। এখন বন্দর কর্তৃপক্ষ বাড়িয়েছে ৪১ শতাংশ। বন্দর কর্তৃপক্ষ হলো একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। তারা এখন লোকসানেও নেই, লাভে আছে। এরপরও কেন এখন ৪১ শতাংশ মাশুল বাড়িয়েছে আমরা বোধগম্য নই। এটি পণ্য রপ্তানিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এই চার্জগুলো যখন আমরা সমন্বয় করব, তখন পণ্য রপ্তানিতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমরা আরও পিছিয়ে পড়ব। দেশ থেকে রপ্তানি কমবে, বিপরীতে দেশে বেকারত্ব বাড়বে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব চার্জের কারণে পণ্য রপ্তানিতে খরচ কেমন বাড়বে এটি আমরা এখন হিসেবে করে দেখিনি। চার্জ বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাবটি ২ থেকে ৩ মাস পরেই বুঝা যাবে।
খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক সৈয়দ সাব্বির আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এমনিতে এখন একটা বিরূপ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের চার্জ বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত অনেকটা ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সরকার যে এতবড় একটা সিদ্ধান্ত নিল, উনারা কাদের সঙ্গে আলাপ করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমরা জানি না। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা না করেই উনারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; যা আমদানি রপ্তানিকে আরও পিছিয়ে দিবে। কারণ বেড়ে যাওয়া খরচটি আল্টিমেটলি ভোক্তার কাঁধে গিয়ে পড়বে। ব্যবসায়ীরা তো আর লোকসান দিবে না, তাই বাড়তি খরচটা যখন ব্যবসায়ীরা সমন্বয় করবে তখন বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে।