আরমান হেকিম
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৫ ১০:১৮ এএম
দেশের বৈদেশিক ঋণ কাঠামো এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পসুদের ঋণ নেওয়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এবং ঋণের ধরন দ্রুত কঠিন শর্তের দিকে ঝুঁকছে। বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি, উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণনীতি পরিবর্তন এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সুদের হার বৃদ্ধির কারণে দেশে বাজারভিত্তিক ঋণের ভাগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে শুধু ঋণের ব্যয় বাড়ছে না বরং সরকারের বাজেট ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৪৩ শতাংশই বাজারভিত্তিক সুদে নেওয়া হবে। এটি আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই হার ছিল মাত্র ২৮ দশমিক ২ শতাংশ। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজারভিত্তিক ঋণের হার ছিল ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র দুই বছরেই এই হার দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়ে গেছে।
ইআরডির বিশ্লেষণ বলছে, আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই বৈশ্বিক বাজারভিত্তিক হবে, যা সরকারের ঋণ পরিশোধ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশ এখন নন-কনসেশনাল ও ব্লেন্ডেড ঋণের দিকে যাচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধের চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।’
নন-কনসেশনাল ঋণের সুদহার সাধারণত ৬-৭ শতাংশের মধ্যে থাকে, যেখানে স্থির সুদের ঋণের হার মাত্র ২ শতাংশ। আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সুদের হার বৃদ্ধিও এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ। জাপান, চীন, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের ঋণের শর্ত কঠোর করছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে।
জাপানের ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার এক দশক ধরে ১ শতাংশের কম ছিল, যা এখন ২ শতাংশে পৌঁছেছে। চীন সুদের হার ২ শতাংশ থেকে ৩ থেকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকও নমনীয় ঋণের হার কমিয়ে বাজারভিত্তিক সুদে ঋণ প্রদান শুরু করেছে। এডিবি থেকে নেওয়া ঋণের মাত্র ২০ শতাংশই ছিল নমনীয়, যার সুদের হার ২ শতাংশের মধ্যে ছিল। বাকি ঋণ বাজারভিত্তিক, যেখানে সুদের হার ৫-৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এসব পরিবর্তন শুধু ঋণের খরচ বৃদ্ধি করছে না, বরং সরকারের বাজেট ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
সরকারের সাম্প্রতিক ঋণ গ্রহণেও এই ধারা প্রতিফলিত হয়েছে। সাতটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের জন্য সরকার ১.৪৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন রূপান্তর, খুলনা পানি সরবরাহ উন্নয়ন (ফেজ-২), নেটওয়ার্ক নর্থওয়েস্ট ডিস্ট্রিবিউশন মডার্নাইজেশন, জলবায়ু সহনশীল সেতু নির্মাণ, বাজেট সহায়তা প্রকল্প, ঢাকা পরিবেশবান্ধব পানি সরবরাহ প্রকল্প এবং সায়েদাবাদ পানি শোধন প্রকল্প। এ প্রকল্পগুলোর অধিকাংশ ঋণ উচ্চ সুদের হারযুক্ত, দীর্ঘমেয়াদি হলেও অনুদান উপাদান সীমিত। ফলে এগুলো কঠিন শর্তের ঋণের আওতায় পড়ে এবং সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের বোঝা বাড়ায়।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনমনীয় ঋণের সুদের হার সাধারণত বাজারভিত্তিক ঋণের চেয়ে বেশি হয় এবং এসব ঋণের গ্রেস পিরিয়ডও কম থাকে। ফলে অর্থনীতিতে ঋণের স্থিতিশীলতা কমে যায়। সোফর ও ইউরিবর ভিত্তিক ঋণের হার বর্তমানে ৬ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। এই পরিস্থিতি নতুন ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়াচ্ছে এবং বাজেট ব্যবস্থাপনাকে আরও সংকীর্ণ করে দিচ্ছে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘স্বল্পসুদে ঋণ পাওয়া এখন অনেক কঠিন এবং এলডিসি মর্যাদা উত্তরণের পর এটি আরও কমে যাবে। এখনই সহজ শর্তে ঋণ নেওয়ার শেষ সময়।’ তবে উপদেষ্টার এই মন্তব্য দেশের ঋণনীতির পরিবর্তনের তাৎপর্যকে রূপায়িত করে, যা শুধু অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তারও একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।
ঋণের এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং একটি নতুন বাস্তবতার পরিচয় দিচ্ছে। বাজারভিত্তিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, সুদের হার বাড়া, গ্রেস পিরিয়ড সংকুচিত হওয়াÑ এসব মিলিয়ে ভবিষ্যতে দেশের ঋণ পরিশোধের বোঝা বহুগুণ বাড়বে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বাংলাদেশের ঋণনীতি এখন শুধুমাত্র ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নেওয়া ৭ দশমিক ৯৪২ বিলিয়ন ডলারের ঋণের মধ্যে ৩ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার বাজারভিত্তিক। এটি একটি সংকেত যে, বাংলাদেশের ঋণনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, যা আগামী বছরগুলোতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কঠিন শর্তের ঋণ শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের প্রজন্মের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।