পাঁচ দুর্বল ব্যাংক
আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৩২ এএম
আর্থিক খাতে দুটি বড় সংস্কার হাতে নিচ্ছে সরকার। এর একটি হলো দুর্বল পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন সংশোধন। স্বাধীনতার পর এটিই সবচেয়ে বড় ধরনের সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে সরকার বেশ তাড়াহুড়ো করে পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিষয় দুটি ওঠছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টাদের বৈঠকে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক বৈঠক (১৩-১৮ অক্টোবর, ওয়াশিংটন) শুরুর আগে এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে তৎপর সরকার। ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি নির্বিঘ্ন রাখতে আইএমএফ যেন কঠিন প্রশ্ন না তোলে, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপনের সবুজ সংকেত পেয়েছেন। আইএমএফের মূল দাবি দুটি, এগুলো হলোÑ বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হ্রাস। সংস্থাটি ব্যাংক একীভূতকরণ পরিকল্পনাকেও স্পষ্টভাবে সমর্থন জানিয়েছে।
বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘যেকোনো বিলম্ব আইএমএফের সমর্থন ব্যাহত করতে পারে। যদি ডিসেম্বরের মধ্যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত না করা হয়, তবে পরবর্তী ঋণের কিস্তি ঝুলে যেতে পারে। একইভাবে ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংক একীভূতকরণ সম্পন্ন না হলে তা স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকার একই প্রতিশ্রুতি বজায় রাখবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
ডিসেম্বরের কিস্তি পেতে বাংলাদেশকে ছয়টি পরিমাণগত কর্মক্ষমতা মানদণ্ড (কিউপিসি) পূরণ করতে হবে, যার মধ্যে তিনটি নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে গত মে মাসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজস্ব সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা এখনও অর্জিত হয়নি। অন্যান্য অগ্রগতি পূরণের পথে। যার মধ্যে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি ও সার খাতে বকেয়া কমিয়ে আনার শর্তও রয়েছে। এসব অর্জিত হলে বাংলাদেশ ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অধীনে ৪৫ কোটি ডলার আশা করছে সরকার।
আইএমএফ মূলত ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৪০৭ কোটি ডলার অনুমোদন করে। এই বছরের জুন মাসে, তারা চতুর্থ এবং পঞ্চম কিস্তি অনুমোদন করে, ছয় মাসের মেয়াদ বৃদ্ধি করে এবং ৮০ কোটি ডলার টপআপ যোগ করে। পরে তা ৫০৫ কোটি ডলারে বৃদ্ধি করা হয়। এখন পর্যন্ত সরকার ৩০৬ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। জুন পর্যন্ত দুই সপ্তাহের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য ২৯ অক্টোবর আইএমএফের একটি মিশন ঢাকায় আসবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার আইএমএফ দলের আগমনের আগে স্বায়ত্তশাসন এবং একীভূতকরণের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি উপস্থাপন করতে চায়। যদি একটি কিস্তি বিলম্বিত হয়, তাহলে অন্য উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার এখনই সেই ঝুঁকি নিতে চায় না।
বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশের পুনর্গঠন
বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশের খসড়া সংশোধনী অনুমোদন করে। ১৯৭২ সালে প্রণীত, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা এবং শাসন প্রতিষ্ঠা করে। প্রস্তাবিত সংশোধনীটি স্বাধীনতার পর থেকে সবচেয়ে বড় সংস্কার; যা আমলাতন্ত্রের আধিপত্য বিলুপ্ত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
খসড়াটি নয় সদস্যের বোর্ড পুনর্গঠন করে। সরকারি আমলাকে তিন থেকে কমিয়ে একজন এবং ব্যাংকিং, অর্থনীতি, আইন ও শিল্পে ছয়জন বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গভর্নর একজন ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রী এবং একজন বর্তমান বা সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি সার্চ কমিটির ভিত্তিতে নিয়োগ দিবে রাষ্ট্রপতি। গভর্নর এবং ডেপুটি গভর্নরদের মেয়াদ চার বছর।
অন্যান্য বিধানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব বেতন স্কেল নির্ধারণ, আর্থিক জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত নিরীক্ষক, রেটিং এজেন্সি এবং মূল্যায়ন সংস্থাগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করতে এবং তথ্য ফাঁসকারীদের সুরক্ষা দিতে পারবে। আইএমএফ এবং আইনি পরামর্শের ভিত্তিতে তৈরি এই সংস্কারগুলো অব্যবস্থাপনা এবং পদ্ধতিগত অপব্যবহারে জর্জরিত একটি খাতে বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।
পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ
গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের একীভূতকরণ পরিকল্পনা অনুমোদন করে। সমস্ত সম্পদ এবং দায় একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামী ব্যাংকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সরকার ২০ দশমিক ২ হাজার কোটি টাকা ইক্যুইটিতে বিনিয়োগ করবে। প্রয়োজনে আমানত বীমা তহবিল থেকে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা তোলা হবে। আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হচ্ছে। আমানতকারীদের জন্য একীভূতকরণ সম্পূর্ণ সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়া, সমস্ত আমানত নিরাপদ রাখা হবে। তারল্যের চাপের ক্ষেত্রে আমানত বীমা তহবিল ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করবে।
শেয়ারহোল্ডারদের জন্য তাদের বিদ্যমান অংশীদারত্বের সমানুপাতিকভাবে নতুন ইক্যুইটি জারি করা হবে। জালিয়াতি বা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ খেলাপির সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারীদের বাদ দেওয়া হবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঁচটি ব্যাংকের সবকিছুই ভিন্ন, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ, নীতি এবং সম্পদ মূল্যায়নÑ একীভূত করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হবে। তা ছাড়া প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইন, আমানত সুরক্ষা আইন এবং দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন (ডিএএমএ) প্রণয়ন করতে হবে। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে একীভূতকরণ চূড়ান্ত করা যাবে না। ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আসন্ন হওয়ায়, শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী মহল এখনও পরিকল্পনাটিকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে পারে।