ব্যাংক খাত
আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৩৮ এএম
আগস্টে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজার স্থিতিশীল ছিল। তবে প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার (আরইইআর) বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। ডলারে দাম কমায় দেশীয় মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই দর ঠিক রাখতে ডলার কিনেছে। তাতেও আরইইআর বৃদ্ধি পাওয়া ঠেকানো যায়নি। ফলে টাকার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রপ্তানিকারকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি এবং রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির কারণে এই টাকার মূল্য বেড়েছে। অন্যদিকে আমদানি চাহিদা থাকা সত্ত্বে তুলনামূলক কমেছে। এতে করে টাকার মূল্য প্রায় ৪ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে রপ্তানিকারকরা আরও চাপের মধ্যে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য এবং তাদের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, জুন মাসে আরইইআর ৯৮ দশমিক ৬১ থেকে আগস্ট মাসে ১০৩ দশমিক ৮৪ এ উন্নীত হয়েছে, যা দুই মাসের মধ্যে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নামমাত্র বিনিময় হার কেবলমাত্র সামান্য পরিমাণে পরিবর্তন হয়েছে। জুলাইয়ের শেষে প্রতি ডলার যেখানে ১২২ দশমিক ৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, আগস্ট মাস শেষে তা ১২১ দশমিক ৬৯ টাকায় নেমে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিন ডলার দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারল্য আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক কেবলমাত্র আগস্ট মাসে ৪৫৪ মিলিয়ন ডলার কিনে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি রোধে পদক্ষেপ নিয়েছে।
ডলার বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ছিল। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রায় ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে। যার মধ্যে জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের শেষের মধ্যে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। এই ক্রয়ের কারণে বিনিময় হারে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। সঙ্গে বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। যা জুলাইয়ে ছিল ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। যা আগস্টে ২৬ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগস্টে আন্তঃব্যাংক স্প্রেড গড়ে শূন্য দশমিক ১৭ টাকায় সংকুচিত হয়েছে, যদিও অস্থিরতা কম ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, জুলাইয়ের দৈনিক স্পট লেনদেন ৪০ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার থেকে ৩৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে সোয়াপ লেনদেন ৮৬ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৭ দশমিক ০৪ মিলিয়ন ডলারে নেমে গেছে। মার্কিন ডলার বহির্ভূত লেনদেন সীমিত ছিল। চার কার্যদিবসে ইউরোতে মোট লেনদেনর পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুলাই-আগস্টে রপ্তানি আয় ছিল ৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। এবং পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধির ফলে বেড়েছে। আমদানি বৃদ্ধি পায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। যার বেশিরভাগই কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে দেখা গেছে, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হয়ে ওঠার ফলে দেশের রপ্তানি নগদ অর্থের সংকোচন হয়। আগস্টে আরইইআর ১০৩ দশমিক ৮৪ হলে সমতা-সামঞ্জস্যপূর্ণ হার হবে প্রতি ডলারে প্রায় ১২৬ দশমিক ২৭ টাকা। তবুও রপ্তানিকারকরা গড়ে প্রতি মার্কিন ডলারে ১২১ দশমিক ৬ টাকা পেয়েছেন।
প্রতি ডলারের ওপর ৪ দশমিক ৬৭ টাকা কমেছে। ফলে ১ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা হারিয়েছে রপ্তানিকারকরা। যা কেবল আগস্ট মাসেই ৩ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘টাকার মূল্য অতিমূল্যায়িত হওয়ার কারণে রপ্তানিকারকদের আয় কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য, আমাদের খরচ কমাতে হচ্ছে।’
এদিকে, রেমিট্যান্স প্রবাহ ৪ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যা ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রণোদনা, মোবাইল এবং এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তৃত অ্যাক্সেস এবং হুন্ডির ওপর নিয়ন্ত্রণের ফলে এই বৃদ্ধি পায় বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রেমিট্যান্স প্রবাহ বাজারের ভারসাম্য পরিবর্তন করেছে। রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আগের থেকে বেড়েছে। আমদানি চাহিদা তুলনামূলকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে টাকার মূল্য প্রায় ৪ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং রপ্তানিকারকরা এখন বিশ্ববাজারে কঠোর প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে ডলার কিনছে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রবাহ শক্তিশালী থাকবে ততক্ষণ এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে হস্তক্ষেপ চলছে তাতে সেপ্টেম্বরে বিনিময় হার আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা রপ্তানিকারকদের স্বার্থ বিবেচনা করে টাকার মূল্য কমানোর চেষ্টা করছি। সেই কারণেই আমরা নিয়মিত বাজার থেকে ডলার কিনছি। এই উদ্যোগ আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে।’
বিশ্লেষকরা বলেছেন, গত শাসনামলে টাকার দর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছিল, যা রপ্তানিকারকদের পক্ষে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পর, বিনিময় হরে বড় পরিবর্তন ঘটে। এই মূল্যবৃদ্ধির চাপ মূলত দুর্বল আমদানি চাহিদার কারণে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক এইভাবে ডলার না কিনলে ১১০ টাকার নিচে নেমে যেত। যার অর্থ টাকা আরও শক্তিশালী হতো। এতে রপ্তানিকারকদের মূল্য নির্ধারণ ক্ষমতা আরও কমে যেত। আমাদের আমদানির পরিমাণ সাধারণত রপ্তানি আয়ের চেয়ে বেশি হয়, তাই টাকার মূল্যবৃদ্ধি আমদানিকারকদের জন্য খরচ কমিয়ে দেয় কিন্তু রপ্তানিকারকদের দিকেও আমাদের তাকাতে হবে।’