এনবিআর
আরমান হেকিম
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৩৩ এএম
দেশে কর আদায়ের হার এখনও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কম। অথচ প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার কর রাজস্ব হারিয়ে যাচ্ছে অস্পষ্ট লেনদেন, কৃত্রিম হিসাব ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির দুর্বলতার কারণে। এ সমস্যা সমাধানে সরকার তথ্যভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার পথে হাঁটছে। এজন্য বিচ্ছিন্ন ও দ্বৈত তথ্যভান্ডারকে একীভূত করে রাজস্ব প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করতে পরিকল্পনা কমিশনের উদ্যোগে শুরু হচ্ছে নতুন একটি ডিজিটাল রূপান্তর কর্মসূচি। যার আওতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দেশের ব্যাংক, পেমেন্ট গেটওয়ে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র বলছে, ‘স্ট্রেংদেনিং ইনস্টিটিউশনস ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ (সিটা) প্রকল্পের অধীনে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো সরকারি সংস্থাগুলোর বিচ্ছিন্ন তথ্য একত্র করে এমন একটি ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা, যা কর ফাঁকি শনাক্ত, সম্পদ লুকানোর প্রবণতা চিহ্নিত ও রাজস্ব আদায় তদারকিতে ব্যবহার করা যাবে।
সম্প্রতি পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে এ-সংক্রান্ত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জানানো হয়, এনবিআর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষ (বিপিপিএ) এবং মহা হিসাব নিরীক্ষক দপ্তরের (ওসিএজি) ডেটাবেজকে একত্র করা হবে, যাতে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তথ্যভিত্তিক সমন্বয় আনা যায়। সভায় প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি বিশেষ সহকারী ফায়েজ আহমাদ তৈয়্যব একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন, যেখানে বলা হয়Ñ বিদেশি সফটওয়্যার নয়, দেশীয়ভাবে তৈরি সিস্টেমেই গড়ে তোলা হবে এই একীভূত ডেটা অবকাঠামো।
ফায়েজ তৈয়্যবের প্রস্তাব অনুযায়ী, এনবিআরকে জাতীয় পেমেন্ট গেটওয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ফলে এনপিএসবি, আরটিজিএস, বিইএফটিএন, একপে, গুগল পে, এসএসএলসহ সব পেমেন্ট প্লাটফর্মের তথ্য সরাসরি এনবিআরের সার্ভারে যাবে। করদাতার লেনদেন, ইনভয়েস ও সম্পদ পরিবর্তনের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে রাজস্ব বোর্ডে পৌঁছে যাবে। এতে ইলেকট্রনিকভাবে ই-ইনভয়েস জারি ও কোম্পানি কর কেটে নেওয়ার (ই-টিডিএস) ব্যবস্থা চালু হবে।
একই সঙ্গে, বিএফআইইউ ও দুদক রিয়েল-টাইমে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ পরিবর্তনÑ যেমন গাড়ি, জমি, শেয়ার কেনাবেচাÑ এনবিআরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানিয়ে দেবে সংশ্লিষ্ট ডেটা নেটওয়ার্ক। এতে সম্পদ গোপন, কর ফাঁকি কিংবা অর্থ পাচারের মতো কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, ডিজিটাল রূপান্তরটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে সরকারি সংস্থাগুলোর বিদ্যমান সফটওয়্যার সিস্টেমগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ সক্ষমতা তৈরি করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে গঠিত হবে ‘জাতীয় তথ্য প্রশাসন ও আন্তঃসম্পর্ক কর্তৃপক্ষ’, যা সব মন্ত্রণালয়ের মূল তথ্যভান্ডারকে একত্র করবে। এই কর্তৃপক্ষ সোর্স কোডের মালিকানা সরকারিভাবে সংরক্ষণ করবে এবং ডেটা ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় সার্ভার পরিচালনা করবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। কর-জিডিপি অনুপাতও নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৭০ শতাংশে।
একই সঙ্গে, এনবিআর বিশেষভাবে মনোযোগ দিচ্ছে ‘বড় করদাতা ইউনিট’ (এলটিইউ) এবং রিয়েল এস্টেট, পেশাজীবী সেবা, ডিজিটাল প্লাটফর্ম ও আমদানি-নির্ভর শিল্প খাতে। এসব খাতে কর ফাঁকি ও ঘোষণার ফাঁক তুলনামূলক বেশি। তথ্যনির্ভর সিস্টেম চালু হলে এসব ক্ষেত্রের অসংগতি সহজেই শনাক্ত করা যাবে।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, ‘রাজস্ব ঘাটতি বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম বড় বাধা।’ তার মতে, প্রযুক্তি দিয়ে যদি লেনদেন ট্র্যাক করা যায়, তবে কর আদায় বেড়ে যাবে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমে আসবে।
তিনি আরও বলেন, ‘যখন কর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন বাড়ে, তখন মানবিক হস্তক্ষেপ কমে, আর তাতেই রাজস্ব বাড়ে।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি একেএম ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘সরকার যদি দেশীয় সফটওয়্যার ব্যবহার করে এই ডেটা ইন্টিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পারে, তা হলে শুধু রাজস্ব বাড়বে না, আইটি খাতেও বড় প্রবৃদ্ধি আসবে।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আগের অনেক সরকারি আইসিটি প্রকল্প বিদেশি পরামর্শকদের ওপর নির্ভর করে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন উদ্যোগে যেন সেই ভুল না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।’
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগ সফল হলে রাজস্ব প্রশাসন থেকে দুর্নীতি কমবে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্যের ব্যবহার বাড়বে এবং জাতীয় বাজেট প্রণয়ন আরও বাস্তবসম্মত হবে। পরিকল্পনা কমিশনের ভাষায়, ‘ডেটাই হবে নীতিনির্ধারণের নতুন মুদ্রা।’