আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৩৫ এএম
ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে আসছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় নানা নীতি ছাড়ে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হচ্ছিল। আবার প্রভাবশালীরা কিস্তি না দিলেও তাদের খেলাপি দেখানো হতো না। সরকার পতনের পর বের হয়ে আসে আসল চিত্র। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ। কিন্তু ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের এই হিসাব যথাযথ নয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী হিসাব করলে দেশে প্রকৃত খেলাপি ঋণ এখন প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা।
এ রকম অবস্থায় গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি কমিটি গঠন করে বিশেষ বিবেচনায় খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে আসায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আনতে বড় করপোরেট ঋণখেলাপিসহ প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আবার ঢালাওভাবে সব ঋণখেলাপিদের এই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলো এবং তা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ বিবেচনায় আরও খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন করতে পারবে ব্যাংকগুলো।
মাত্র দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্টের বিপরীতে ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা যাবে। দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড এবং সংশ্লিষ্ট খাতের সর্বনিম্ন সুদহারের চেয়েও এক শতাংশ কম সুদ নির্ধারণ করা যাবে। ব্যাংকগুলোই এসব সুবিধা দিতে পারবে।
কোনো কারণে প্রয়োজন হলে ৩০০ কোটি টাকার বেশি ঋণে নীতি সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাছাই কমিটিতে আবেদন করা যাবে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীকে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত সরকারের ছত্রছায়ায় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট হয়েছে, যার একটা বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়েছে।’
ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় ও আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নীতি সহায়তা প্রদান শীর্ষক সার্কুলারে বলা হয়েছে, আগস্ট ২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পূর্ববর্তী সময়ে দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী অনেক ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে ঋণ বা ঋণের কিস্তি পরিশোধে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছেন।
চলতি বছরের ৩০ জুন বিরূপমানে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বিবেচনায় ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে পুনঃতফসিল করা যাবে। এজন্য আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করতে হবে। আবেদনের ৬ মাসের মধ্যে ব্যাংক থেকে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।
নীতি সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট চেক বা অন্য কোনো ইনস্ট্রুমেন্টের মাধ্যমে দিলে তা নগদায়নের পর হতে ৬ মাস গণনা করতে হবে। ডাউন পেমেন্টের অর্থ ব্যাংকের অনুকূলে নগদায়নের আগে নীতি সহায়তার আবেদন কার্যকর করা যাবে না। ইতঃপূর্বে তিন বা তার বেশি পুনঃতফসিল করা ঋণে অতিরিক্ত ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট আদায় করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নীতি সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নিতে হবে না। তবে এ বিষয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ হতে অনুমোদন নিতে হবে। একাধিক ব্যাংক হতে ঋণের বিপরীতে নীতি সহায়তার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঋণ প্রদানকারী ব্যাংক বা সবার সম্মতিতে নীতি সহায়তার উদ্যোগ ও সভার আয়োজন করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
৩০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ স্থিতির ঋণগ্রহীতাকে নীতি সহায়তার বিষয়ে ব্যাংক থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না হলে আন্তঃব্যাংক সভার কার্যবিবরণী বা পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনসহ ‘ব্যবসা ও আর্থিক ব্যবস্থাদি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গঠিত নীতি সহায়তা সংক্রান্ত বাছাই কমিটি’ বরাবর আবেদন পাঠাতে হবে।
বিশেষ সুবিধা দেওয়া ঋণের বিপরীতে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সাধারণ প্রভিশন রাখতে হবে। বিশেষ সুবিধা পাওয়া ঋণ এসএমএ মানে শ্রেণিকরণ করে সাধারণ প্রভিশন রাখতে হবে। প্রকৃত আদায় ছাড়া ব্যাংকের আয় খাতে স্থানান্তর করা যাবে না।
তবে সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণের জন্য স্থানান্তর করা যাবে। এ ধরনের সুবিধা দেওয়া ঋণে নতুন সুবিধা দেওয়া যাবে। এক্ষেত্রে অতীত লেনদেনসহ সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে। আর ২০২২ সালে শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানির জন্য বাকিতে খোলা এলসির ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার অপ্রত্যাশিত বিনিময় হারজনিত ক্ষতির মোট পরিমাণ গত বছর জারি করা সার্কুলারের নির্দেশনা অনুযায়ী হিসাবায়ন করতে হবে। কোনো গ্রাহক চাইলে পুনর্গঠন বা এককালীন এক্সিট সুবিধা নিতে পারবে।
জাল-জালিয়াতি বা অন্য কোনো ধরনের প্রতারণা বা অনিয়মের মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণের ক্ষেত্রে এ সার্কুলারে বর্ণিত সুবিধা দেওয়া যাবে না। ব্যাংক থেকে চূড়ান্তভাবে ঘোষিত ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা এ সার্কুলারে বর্ণিত সুবিধাদি পাবে না। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতার ক্ষতির পরিমাণ এবং প্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা এক্সিটের মেয়াদকাল নির্ধারণ করতে হবে।
মেয়াদকাল নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপিত স্মারকে এবং সভার কার্যবিবরণীতে সুস্পষ্ট কারণ সুনির্দিষ্টভাবে লিখতে হবে। সুবিধা দেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ব্যাংক ও গ্রাহক সোলেনামার মাধ্যমে চলমান মামলা স্থগিতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পরবর্তীতে কোনো গ্রাহকের দেওয়া সুবিধার কোনো শর্ত ভঙ্গ করলে তার অনুকূলে প্রদত্ত সকল সুবিধা বাতিল বলে গণ্য হবে এবং ব্যাংক ঋণ আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত সরকারের সময় লুকানো খেলাপি ঋণ এখন বেরিয়ে আসায় ব্যাংক খাতে সার্বিকভাবে এর পরিমাণ তাদের হিসাবে সোয়া ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
এজন্য যেকোনো ঋণ বিতরণের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) থেকে যাচাই করতে হয়। তবে অনেকেই উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নেওয়ার কারণে সিআইবিতে খেলাপি দেখানো হয় না। ফলে ঋণ পরিশোধ না করেও সব ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঋণখেলাপিদের ঢালাও আইনি সুরক্ষা বন্ধের জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং অর্থ ঋণ আদালত আইন সংশোধনের মাধ্যমে আরও কঠোর বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছেন তারা। এজন্য বিভিন্ন ব্যাংকে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে কী পরিমাণ ঋণ আটকে আছে এবং ব্যাংকের রিপোর্টে দেখানো হচ্ছেÑ এমন খেলাপি ঋণের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।