প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২১:৩৮ পিএম
বাংলাদেশের ওপর বেমক্কা খবরদারি শুরু করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। প্রথমবারের মতো তারা বাংলাদেশের ওপর বিদেশি ঋণ গ্রহণে কঠোর সীমা আরোপ করেছে। তাদের আরোপিত উটকো এই নতুন শর্ত অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৮৪৪ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ নিতে পারবে। এ ছাড়া বছরের বিভিন্ন পর্যায়ে ঋণ গ্রহণের জন্য পৃথক সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম তিন মাসে সর্বোচ্চ ১৯১ কোটি ডলার, ছয় মাসে ৩৩৪ কোটি ডলার, ৯ মাসে ৪৩৪ কোটি ডলার এবং পুরো অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৮৪৪ কোটি ডলার ঋণ নেওয়া যাবে। আইএমএফ প্রতি তিন মাস অন্তর এই ঋণ গ্রহণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবে এবং শর্ত অনুযায়ী অগ্রগতি যাচাই করবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) বাংলাদেশ মোট ৮৫৭ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ইতোমধ্যেই ২০ কোটি ২৪ লাখ ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন শর্ত অনুসারে ঋণ গ্রহণে সরকারের সক্ষমতা সীমিত হবে। এর ফলে চলতি অর্থবছরে সরকারের জন্য বিদেশি ঋণের উৎস পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা এবং নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইএমএফের ২০২৩ সালের ঋণ অনুমোদনের সময় এমন শর্ত আরোপ করা হয়নি। তবে গত জুনে ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি অনুমোদনের পর মূল ঋণের পরিমাণ ৮০ কোটি ডলার বৃদ্ধি ও মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হয়। এই সুযোগে আইএমএফ নতুন শর্ত আরোপ করে, যা বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনায় এক নতুন ধারা তৈরি করছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি থেকে মোট ৩৬০ কোটি ডলার পেয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, সর্বশেষ ঋণ স্থায়িত্ব বিশ্লেষণ (ডিএসএ) অনুযায়ী বাংলাদেশ ‘কম ঝুঁকি’ থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’র দেশ হিসেবে পুনর্বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ ও রপ্তানির অনুপাত ১৬২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা পূর্বাভাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশি ঋণ ও রাজস্বের অনুপাতও বেড়ে যাওয়ায় দেশের ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এটি শুধু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের প্রতিফলন নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় একটি নতুন ধারা নির্দেশ করছে।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময় বিভিন্ন মেগা প্রকল্প ও করোনা মহামারি সংক্রান্ত ব্যয়ের কারণে দেশের বিদেশি ঋণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৩ বছরে বাংলাদেশের ঋণ তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ঋণ বৃদ্ধির ঘটনা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০০৯-১০ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ ছিল মাত্র ২০৩ কোটি ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০২ কোটি ডলারে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত উদ্বেগের প্রয়োজন নেই। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঋণ গ্রহণের হার আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে, যা দেশের ঋণ ব্যবস্থাকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখছে। তবে দীর্ঘমেয়াদিভাবে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে বিদেশি ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ও ব্যবস্থাপনায় আরও নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনা জরুরি।
এভাবে আইএমএফের শর্ত বাংলাদেশের ঋণনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা আগামী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এ সিদ্ধান্ত শুধু একটি সংখ্যাগত সীমা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক সুস্থতার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।