আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৬:৫৯ পিএম
চট্টগ্রামে টানা লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে দুটি সরকারি কারখানা। এর একটি হচ্ছে দেশের একমাত্র সরকারি কাঁচ কারখানা উসমানিয়া গ্লাস শিট। অন্যটি চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ পাটকল আমিন জুট মিল। তবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠান দুটিতে কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যন্ত্রপাতি।
চট্টগ্রাম নগরীর আতুরার ডিপো এলাকায় ১৯৫৪ সালে প্রায় ৮০ একর জমির ওপর আমিন জুট মিলস যাত্রা শুরু করে। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর এটিকে জাতীয়করণ করা হয়। তবে টানা লোকসানের মুখে ২০২০ সালের ১ জুলাই কারখানাটি বন্ধ করে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আমিন জুট মিলসের মোট লোকসানের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি। কারখানাটি বন্ধ হওয়ায় চাকরি হারান প্রায় চার হাজার শ্রমিক। এখন কারখানা বন্ধ থাকলেও প্রশাসনিক কাজে যুক্ত আছেন ১২৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী।
বন্ধ হলেও গত চার অর্থবছরে পরিচালন বাবদ খরচ হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেতন-ভাতা বাবদ প্রতিবছর গড়ে ৮ কোটি টাকা করে মোট ৩২ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়েছে চার বছরে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি। এ ছাড়া জ্বালানি, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ, বীমাসহ বিভিন্ন খাতে বাকি অর্থ ব্যয় হয়। আমিন জুট মিলসের নিরীক্ষা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
উৎপাদন বন্ধ থাকলেও অবশ্য আয় বন্ধ হয়নি আমিন জুট মিলসের। চার বছরে প্রতিষ্ঠানটি আয় করেছে ৪৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। মূলত কারখানা বন্ধ হওয়ার আগে উৎপাদিত পণ্য, স্ক্র্যাপসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিক্রি করে এ অর্থ আয় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শেষ চার অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ৫৩ কোটি টাকা।
বন্ধ কারখানার পেছনে চার বছরে শতকোটি টাকা খরচে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আমিন জুট মিলস সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক। তিনি বলেন, শ্রমিক নেই, কারখানাও বন্ধ, কর্মকর্তারা বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। মানুষের কষ্টের টাকা এভাবে খরচ করার কোনো মানে হয় না। আবার জায়গাও দখল হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তা উদ্ধারেও কোনো তৎপরতা নেই কর্তৃপক্ষের।
এ ছাড়া দুই বছর ধরে বন্ধ দেশের একমাত্র সরকারি কাচ কারখানা উসমানিয়া গ্লাস শিট। ২০২৩ সালে এটি বন্ধ করা হয় লোকসানের কারণে। ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠান ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এটি দেশে একমাত্র গ্লাস শিট উৎপাদন কারখানা ছিল। বেসরকারি খাতে ১৯৯৭ সালে এমইবি গ্রুপ এবং ২০০৫ সালে পিএইচপি ও নাসির গ্রুপ উৎপাদনে এলে ধস নামে উসমানিয়ার বাজারে। প্রতিযোগীরা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে বৈদেশিক পণ্যের সহজলভ্যতার কারণে কোম্পানির মুনাফা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হওয়ার সময় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল ১২ কোটি টাকা। সেই বছর কোম্পানিটি মোট ২ কোটি ২০ লাখ টাকার কাচ বিক্রি করেছে। অথচ এসবের উৎপাদন ব্যয় ছিল ১০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। গত এক যুগে সরকারি এই কোম্পানি লাভের মুখ দেখেনি। কোম্পানিটি সর্বশেষ মুনাফা করেছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। ওই বছর প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল কোম্পানিটি। এর পর থেকে লোকসান গুনছে উসমানিয়া। গত ১০ অর্থবছর ধরে গড়ে ৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে এই প্রতিষ্ঠান।
উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১০৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। তাদের সবার বেতন চলছে বিসিআইসির টাকায়। গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বিসিআইসি থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৩৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকার বেশি। সব মিলিয়ে উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেডের দায় প্রায় ৬১ কোটি টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) একেএম আনিসুজ্জামান বলেন, ‘কারখানা চালুর বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমাদের পক্ষ থেকে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, বর্তমান বাজারে বিদ্যমান প্রযুক্তি দিয়ে কারখানাটি চালু করা হলে লাভ হবে কি না, তা অনিশ্চিত। বর্তমানে ঋণ নিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হচ্ছে, এতে তেমন সমস্যা হচ্ছে না।’